পাকিস্তানেও ‘পরিবর্তন’! ‘রহমান’ হল ‘রাম’, বাবরি মসজিদ হয়ে গেল মন্দির

24

নিউজ ডেস্ক: দেশভাগের প্রায় আশি বছর পর, পাকিস্তানের লাহোরের রাস্তাগুলো তাদের ইসলামি পরিচয় ঝেড়ে ফেলছে। পুরোনো হিন্দু, শিখ, জৈন এবং ঔপনিবেশিক নামগুলোতে ফিরে আসছে। এখন ‘রহমান গলি’ হয়েছে ‘রাম গলি’। বাবরি মসজিদ চকের নাম বদলে হয়েছে জৈন মন্দির। গত ২ মাসে এমন ১৫ জায়গার নাম পরিবর্তি হয়ে গেছে। আরও অনেক জায়গা তাদের পুরনো গৌরবে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কী এমন হল পাকিস্তানে? চর্চা শুরু হয়েছে ভারতে।

এই নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের পেছনে কারা?
এই নাম পরিবর্তন অভিযানটি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ সরকারের বৃহত্তর ‘লাহোর হেরিটেজ এরিয়া রিভাইভাল’ (LHAR) প্রকল্পের অংশ। যার লক্ষ্য দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানীকে তার দেশভাগের আগের ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনা। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের স্বপ্নের প্রকল্প। যার লক্ষ্য কয়েক দশকের অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আদর্শগত বিকৃতির পর শহরটির স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক কাঠামো পুনরুদ্ধার করা।

কোন কোন জায়গার নাম বদল:
সুন্নাত নগর-এর পরিবর্তিত নাম সান্ত নগর
মৌলানা জাফর আলি খান চক-এর পরিবর্তিত নাম লক্ষ্মী চক
মুস্তাফাবাদ–এর পরিবর্তিত নাম ধরমপুরা
স্যর আগা খান চক-এর পরিবর্তিত নাম ডাভিস রোড
আল্লামা ইকবাল রোড-এর পরিবর্তিত নাম জেল রোড
ফতিমা জিনহা রোড-এর পরিবর্তিত নাম কুইনস রোড
বাঘ-ই-জিন্নাহ-এর পরিবর্তিত নাম লউরেন্স গার্ডেনস
ইসলামপুরা-এর পরিবর্তিত নাম কৃশান নগর
হামিদ নিজামি রোড-এর পরিবর্তিত নাম টেম্পল স্ট্রিট
নিশতার রোড-এর পরিবর্তিত নাম ব্রান্দ্রেথ রোড
রহমান গলি-এর পরিবর্তিত নাম রাম গলি
বাবরি মসজিদ চক-এর পরিবর্তিত নাম জৈন মন্দির রোড
গাজিয়াবাদ-এর পরিবর্তিত নাম কুমহারপুরা
জিলানি রোড-এর পরিবর্তিত নাম আউটফল রোড
শাহরাহ-আই-আব্দুল হামিদ বিন বাদিস-এর পরিবর্তিত নাম এম্প্রেস রোড

নওয়াজ শরিফ এবং তাঁর কন্যা, পাঞ্জাব প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ, ২০২৫ সালে এই পরিবর্তনের যাত্রা শুরু করেন। সরকারের যুক্তি, ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো পাকিস্তানেরও উচিত তার শহরগুলোর ঐতিহাসিক ঐতিহ্য মুছে ফেলার পরিবর্তে সংরক্ষণ করা। এই উদ্যোগের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হল ঐতিহ্য পর্যটনকে উৎসাহিত করা, যার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।

মিন্টো পার্ক বিতর্ক:
দেশভাগের আগে হিন্দুরা মিন্টো পার্কে দশেরা উৎসব পালন করতেন।
নওয়াজ শরিফ মিন্টো পার্কে (গ্রেটার ইকবাল পার্ক) তিনটি ক্রিকেট মাঠ এবং একটি ঐতিহ্যবাহী ‘আখাড়া’ (কুস্তির আখড়া) পুনরুদ্ধারের প্রস্তাবও দিয়েছেন— যা ব্যাপকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নয়াজ শরিফের ভাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ২০১৫ সালে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন শাহবাজ শরিফ একটি নগর উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনটি ঐতিহাসিক ক্রিকেট মাঠ, ক্রিকেট ক্লাবের অধীনস্থ এলাকা এবং একটি কুস্তির আখড়া ভেঙে ফেলার জন্য তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রাক্তন অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হকের মতো বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার মিন্টো পার্কের এই ক্রিকেট ক্লাবগুলিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

দেশভাগের আগে ভারতীয় ক্রিকেটার লালা অমরনাথও এই ক্লাবগুলিতে প্রশিক্ষণ নিতে যেতেন। ১৯৭৮ সালে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে লাহোর সফরে গিয়ে অমরনাথ মিন্টো পার্কে ক্রিসেন্ট ক্রিকেট ক্লাবের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। যে ক্লাবের হয়ে তিনি দেশভাগের আগে পর্যন্ত খেলতেন। মিন্টো পার্কের ভেঙে ফেলা কুস্তি আখড়ায় একসময় গুঙ্গা পালোয়ান, ইমাম বখশ এবং গামা পালোয়ানের মতো প্রবীণ কুস্তিগীরদের লড়াই অনুষ্ঠিত হত।

নাম পরিবর্তনের আসল কারণ:
ইতিহাস সাক্ষী যে, দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের বিশেষ করে হিন্দু ও শিখদের—দুর্দশা এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ওপর নিপীড়ন, জোরকরে ধর্মান্তর, তাদের সম্পত্তিতে অবৈধ দখল এবং ঐতিহাসিক মন্দির ধ্বংসের মতো ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে নিয়মিত সামনে এসেছে। তবে, আশ্চর্যজনকভাবে, কয়েক দশক ধরে ইসলামিকরণে প্রভাবিত একটি দেশে এই নাম পরিবর্তনের উদ্যোগটি প্রায় কোনও বিরোধিতা ছাড়াই বাস্তবায়িত হয়েছে।

পুরোনো নাম ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে পাকিস্তান বিশ্ব সম্প্রদায়কে, বিশেষ করে পশ্চিমি দেশগুলোকে দেখাতে চায় যে দেশটি তার ‘উগ্রপন্থী ভাবমূর্তি’ ত্যাগ করে সহনশীল এবং বহুসংস্কৃতির রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। যার ফলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম হবে।

সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার অভিযোগে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় রয়েছে। যার ফলে দেশের অর্থনীতিতে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। লাহোরের মতো একটি প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ঔপনিবেশিক আমলের নাম ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে পাকিস্তান এমন একটি আখ্যান তৈরি করতে চাইছে, যা থেকে মনে হবে দেশটি চরমপন্থাকে পিছনে ফেলে আসছে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (FATF) বা অন্যান্য বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানকে পাকিস্তানের উপর পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা থেকে বিরত রাখা।

টিকে থাকার জন্য ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) একটি বেলআউট প্যাকেজের ওপরও সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। IMF শুধু অর্থনৈতিক তথ্যই খতিয়ে দেখে না বরং একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক পরিস্থিতির উপরও সতর্ক দৃষ্টি রাখে। নাম পরিবর্তনের এই প্রহসন বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং IMF-কে এও আশ্বস্ত করে যে, দেশটি বিনিয়োগের জন্য একটি নিরাপদ ও উদার গন্তব্য হয়ে উঠছে।