নিউজ ডেস্ক: নগাঁও লোকসভা উপনির্বাচনে প্রাক্তন আমলা দেবাশিস শর্মাকে প্রার্থী করার বিজেপির সিদ্ধান্ত শুধু একজন আমলা-থেকে-রাজনীতিকে পরিণত হওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বরং এটি অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার একটি সুপরিকল্পিত কৌশলী পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল এমন একটি কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়া, যেখানে বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক ও জনভিত্তি থাকা সত্ত্বেও বিজেপির সামনে রয়েছে জনবিন্যাসের কঠিন চ্যালেঞ্জে।
২০২৩ সালে সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে নগাঁও লোকসভা কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। শুক্রবার দেবাশিস শর্মার নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে বিজেপি। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এমন একজন প্রাক্তন প্রশাসকের ওপর বাজি ধরেছেন, যার গ্রহণযোগ্যতা দলের প্রথাগত সমর্থক গোষ্ঠীর গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত। এর মূল উদ্দেশ্য বিজেপির নিজস্ব ভোটব্যাংককে ধরে রাখার পাশাপাশি মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও প্রভাব বিস্তার করা।
কংগ্রেসের দুবারের সাংসদ প্রদ্যুত বরদলৈ পদত্যাগ করায় ৬ অক্টোবর এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রদ্যুৎ বরদলৈ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে দিশপুরের বিধায়ক।
২০২৩ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর নগাঁওয়ের নির্বাচনী সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। মুসলিম-প্রধান ধিং, রূপহীহাট এবং সামাগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে লোকসভা কেন্দ্রের মোট ভোটারের মধ্যে মুসলিম ভোটারের আনুমানিক হার ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।
এর প্রভাব ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্পষ্ট। প্রদ্যুৎ বরদলৈ ৭,৮৮,৮৫০ ভোট পেয়েছিলেন যা ৫০.৯ শতাংশ। বিজেপি প্রার্থী সুরেশ বরা পান ৫,৭৬,৬১৯ ভোট, ৩৭.২ শতাংশ। প্রদ্যুৎ জেতেন ২,১২,২৩১ ভোটে। অন্যদিকে এআইইউডিএফ-এর আমিনুল ইসলাম পেয়েছিলেন ১,৩৭,৩৪০ ভোট।
অঙ্কের হিসেবে বিজেপির কাজটা বেশ কঠিন। যদিও বিজেপির কাছে ইতিমধ্যেই একটি শক্তিশালী ও সুনিশ্চিত ভোটব্যাংক রয়েছে। নগাঁওয়ের মুসলিম ভোটব্যাংককে পুরোপুরি নিজেদের পক্ষে আনার প্রয়োজন বিজেপির নেই, বরং নিজেদের ভোটব্যাংককে সংহত রেখে প্রতিপক্ষের মুসলিম ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরানোই বিজেপির লক্ষ্য। ঠিক এই কারণেই দেবাশিস শর্মা বিজেপির একজন ব্যতিক্রমী প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন।
৩৪ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকারী আমলা দেবাশিস শর্মা কেবল দলীয় পরিচয়ের ওপর ভর করে নগাঁওয়ের নির্বাচনী ময়দানে নামেননি। সরকারি চাকরির শেষ পর্যায়ে তিনি নগাঁওয়ের জেলাশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যার ফলে এই নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। সবার জন্য সহজলভ্য হওয়া এবং সরাসরি মানুষের কাছে গিয়ে কাজ করার ধরন তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সদিচ্ছা এনে দিয়েছিল, বিজেপির ধারণা তাই, এর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশও অন্তর্ভুক্ত।
তবে তাঁর জনসেবামূলক পরিচিতি নগাঁওয়ের দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগে থেকেই গড়ে উঠেছিল। মুম্বাইয়ের অসম ভবনে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকাকালীন চিকিৎসার জন্য অসম থেকে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে আসা ক্যানসর রোগীদের সহায়তার কাজে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি নভি মুম্বাইয়ের অসম ভবনকে ক্যান্সার রোগীদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে ক্যান্সার রোগীদের সেবায় নিবেদিত দীপশিখা নামক একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। কোভিড লকডাউনের সময়, মুম্বাইয়ে আটকে পড়া ক্যানসার রোগীদের আসামে ফিরিয়ে আনার কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়াতে সমন্বয় করেছিলেন দেবাশিস শর্মা।
এই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা সোশ্যাল ক্যাপিটাল দেবাশিস শর্মাকে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নগাঁও-কেন্দ্রিক নির্বাচনী কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। প্রথাগত কোনও বিজেপি রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস হয়তো লড়াইটিকে কেবল সংখ্যালঘু ভোট একজোট করার লড়াইয়ে পরিণত করার চেষ্টা করত, কিন্তু দেবাশিস শর্মার উপস্থিতি সেই সমীকরণকে জটিল করে তোলে। তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু আদর্শগত অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং প্রশাসনিক কাজের দক্ষতা এবং মানুষের কাছে সহজে পৌঁছনোর ক্ষমতার ওপরও তা অনেকাংশে নির্ভরশীল।
দেবাশিসের প্রার্থী হওয়ার পেছনে একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলও কাজ করছে। রাজনৈতিক মহলে দেবাশিস শর্মার নগাঁওয়ের জেলাশাসক হিসেবে নিয়োগকেই পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ভূমিকার প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। প্রদ্যুৎ বরদলৈয়ের হঠাৎ বিজেপিতে যোগ দেওয়া এবং সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘটনা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। চাকরির মেয়াদ আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতেই এই আমলা স্বেচ্ছায় অবসর নেন এবং তার কয়েক দিনের মধ্যেই বিজেপিতে যোগ দেন।
বস্তুত, নগাঁও আসনটি ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির জন্য দুর্ভেদ্য কোনো দুর্গ নয়। রাজেন গোহাঁই ১৯৯৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত টানা চারবার এই আসনে বিজেপির পক্ষে জয়ী হয়েছিলেন। কংগ্রেস ২০১৯ সালে এটি পুনরুদ্ধার করে, যখন প্রদ্যুৎ বরদলৈ বিজেপির রূপক শর্মাকে মাত্র ১৬,৭৫২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন।
আরেকটি বিষয়ও বিজেপির অনুকূলে যেতে পারে। বিরোধী ঐক্যের জন্য কংগ্রেসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এআইইউডিএফ ইতিমধ্যেই প্রাক্তন আমসু নেতা রেজাউল করিম সরকারকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এআইইউডিএফ যদি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে, তবে তা সংখ্যালঘু ভোটকে বিভক্ত করতে পারে, যে ভোটব্যাংক গত দুটি লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
বলা যায় হিমন্ত বিশ্ব শর্মার অঙ্ক তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: বিজেপির নিজের ভোট ধরে রাখা, নিজের প্রশাসনিক ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়ে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে কিছুটা হলেও প্রভাব বিস্তার করা এবং কংগ্রেস ও এআইইউডিএফ-এর মধ্যে বিভাজনের সুবিধা নেওয়া।
নগাঁওয়ের রাজনীতি রাতারাতি বদলে দেওয়ার জন্য বিজেপির দেবাশিস শর্মাকে প্রয়োজন নেই। তাদের প্রয়োজন তাঁকে দিয়ে নির্বাচনী এলাকার স্পষ্ট জনতাত্ত্বিক বিভাজনের মধ্যে সামান্য কিছু ভোট এদিক-সেদিক করানো। তিনি যদি তা করতে পারেন, তবে একজন জনপ্রিয় জেলাশাসককে রাজনীতিতে নিয়ে আসার বিষয়ে হিম্তর সিদ্ধান্ত একটি কৌশলী ও সফল নির্বাচনী পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।