নিজের দেশে দুর্বল ডোনাল্ড ট্রাম্প, কী প্রভাব ভারত-পাকিস্তানে?

22

নিউজ ডেস্ক: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে দুর্বল হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। এই ঘটনা ভারত ও পাকিস্তান— উভয় দেশের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হাতে চলে যাওয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় ধাক্কা। ভারতের ক্ষেত্রে, ট্রাম্প দুর্বল হয়ে পড়ায় তাঁর শুল্ক ও অভিবাসন নীতিগুলো আরও কঠোর পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে, একইসঙ্গে, ভারতের জন্য একটি সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার সুযোগও তৈরি হতে পারে। পাকিস্তানের জন্য এই পরিবর্তন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে তাদের বিভিন্ন গোপন ও প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো এখন কঠোর পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে। উল্লেখ্য, এসব চুক্তির মাধ্যমেই পাকিস্তান ট্রাম্পের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
যদিও ট্রাম্প ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন, তবুও তিনি আর নিজের ইচ্ছামতো আইন পাস করাতে বা নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। তাঁর প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরে তাঁকে আরও প্রতিকূল কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ভারতের ওপর কী প্রভাব?
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর, ট্রাম্প তাঁর সমর্থকগোষ্ঠীর কাছে নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্য পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় কোনও সাফল্য অর্জনের মরিয়া চেষ্টা করবেন। ভারতের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা তাঁর অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারত এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকে এমন একটি অনুকূল চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে, যা গত কয়েক মাস ধরে স্থবির হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে, ভারত এতদিন অপেক্ষা করছিল এই নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য যে, চিন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় তারা যেন শুল্কের ক্ষেত্রে আরও ভালো শর্ত পায়।
এর বাইরে, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ‘ট্রেড অ্যাক্ট’-এর ৩০১ নম্বর ধারার অধীনে ভারত সহ অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য, এসব দেশ কৌশলগতভাবে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ক্ষতি করছে কি না, তা যাচাই করা।
এসব বিষয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন, দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্প হয়তো ভারতীয় আলোচকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারেন, যার ফলে তড়িঘড়ি করে কোনও চুক্তিতে পৌঁছানোর চাপ তাদের ওপর কিছুটা কমতে পারে। তবে এর উলটো দিকও রয়েছে— এর মানে এই নয় যে, দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করার পথটি সহজ হয়ে যাবে।
ট্রাম্প তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ অব্যাহত রাখতে পারেন। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস চাইলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না।
তবে কংগ্রেস যা করতে পারে তা হল, ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক কীভাবে মার্কিন ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলছে তা খতিয়ে দেখা। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ আরও বাড়তে পারে।

এইচ-১বি (H-1B) ভিসা: ভারত কি স্বস্তি আশা করতে পারে?
ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এমন আরেকটি ক্ষেত্র হল অভিবাসন।
দক্ষ বিদেশি কর্মীদের, বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির আওতাভুক্ত কর্মীদের, বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ ভারতীয় পেশাজীবী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি ভিসার জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলারের মতো বড় অঙ্কের ফি নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি, যেসব কোম্পানি মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করছে, তাদের এইচ-১বি ভিসার আবেদন কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য ফেডারেল সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে।
এই উভয় পদক্ষেপই পরোক্ষভাবে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের ওপর প্রভাব ফেলেছে, যারা এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ।
বস্তুত, অনুমোদিত প্রতি চারটি এইচ-১বি ভিসার মধ্যে প্রায় তিনটিই ভারতীয় নাগরিকদের দখলে; অর্থাৎ, তারাই আমেরিকার প্রযুক্তি খাতের মেরুদণ্ড।
স্বল্পমেয়াদে হয়তো কোনো স্বস্তি মিলবে না, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের জন্য সুখবর বয়ে আনতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটরা ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আচরণের বিষয়টি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

পাকিস্তানের ওপর কী প্রভাব?
পাকিস্তানের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইসলামাবাদ গত দেড় বছর ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। মূলত তোষামোদ এবং তাঁর অতি-অহংকে তুষ্ট করার মাধ্যমে। এর মধ্যে কিছু প্রচেষ্টা ছিল ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে।
এরই একটি হল ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’-এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা; এটি ট্রাম্প পরিবারের প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এর অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
এ ছাড়া, চলতি বছরের শুরুর দিকে পাকিস্তান মার্কিন কোম্পানি ‘পাওয়ারাস’-এর সঙ্গে বেশ কিছু চালকবিহীন আকাশযান (ড্রোন) সংগ্রহের চুক্তি করে। এই কোম্পানির সঙ্গে ট্রাম্পের ছেলেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই দুটি চুক্তির ক্ষেত্রেই মূল ভূমিকা পালন করেছেন দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সেনাপ্রধান আসিম মুনির— যাঁকে ট্রাম্প ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন।
গত সেপ্টেম্বরে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে পাকিস্তান মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস’-এর সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা স্বাক্ষর করে।
এর পাশাপাশি রয়েছে নিউইয়র্কের রুজভেল্ট হোটেল সংস্কারের চুক্তি; এই হোটেলের মালিক পাকিস্তানের জাতীয় বিমান সংস্থা। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যবস্থাটি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে স্টিভ উইটকফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এখন, মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অর্থ হল— ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বিরুদ্ধে আরও বেশি তদন্ত ও শুনানির সম্ভাবনা তৈরি হওয়া। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা ট্রাম্প পরিবারের শেয়ার কেনাবেচা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত করবেন। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসায়িক লেনদেনগুলো সম্ভবত আরও কঠোর পর্যালোচনার মুখে পড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীও হয়তো এই তদন্ত প্রক্রিয়ার জালে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট
মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ভারত ও পাকিস্তানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে, রিপাবলিকানদের বড় ধরনের পরাজয় ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ক্ষেত্রে ভারতকে কিছুটা বাড়তি সুযোগ দিতে পারে; এর ফলে তাদের ওপর প্রতিকূল শর্ত মেনে নেওয়ার চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে, ভারত-মার্কিন সম্পর্কের অস্থির সময়কাল হয়তো এতে পুরোপুরি শেষ হবে না।
পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের মূল কারণ হলো, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে তারা যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, মার্কিন কংগ্রেস তা খতিয়ে দেখতে পারে— এমন সম্ভাবনা।