নিউজ ডেস্ক: গ্রেট নিকোবর দ্বীপে ১৩ হাজার কোটি টাকার বিমানবন্দরের অনুমতি দিল কেন্দ্র। তবে আইএনএস বাজের কোনও সম্প্রসারণে সম্মতি দেওয়া হয়নি।
নতুন বিমানবন্দরে তৈরি হবে গালাথিয়া বে-র কাছে চিংগেনে। যা মিলিটারি ও সাধারণ যাত্রী উভয়েই ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিরক্ষা সূত্র জানিয়েছে যে ৪৫০০ ফুটের রানওয়ে আইএনএস বাজকে ১০ হাজার ফুটে সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয়, কারণ পরিকাঠামো, ভূমির রূপ এবং নৌচালনা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ৮১ হাজার কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প রূপায়ণ করার লক্ষ্য কেন্দ্রীয় সরকারের। তারই একটি অঙ্গ হবে গালাথিয়া বে-র কাছে চিংগেনে ১৩ হাজার কোটি টাকার বিমানবন্দর। আইএনএস বাজকে সম্প্রসারিত না করে নতুন একটি বিমানবন্দর তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, গালাথিয়া বে-র কাছে চিংগেনে বিমানবন্দর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা এটি মালাক্কা প্রণালীর খুব কাছে পশ্চিম দিকে থাকবে। ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চিন সাগরের নৌচলাচলে সংযোগ হিসাবে কাজ করে মালাক্কা প্রণালী এবং বলাবাহুল্য ইরানের হরমুজ প্রণালীর মতো এটিও অত্যন্ত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সাগরীয় জলপথ।
এই প্রণালী দিয়েই গোটা বিশ্বের অনেক গ্যাস ও জ্বালানি পারাপার করে, ভারত মহাসাগরের পূর্বদিকে নিকোবর কৌশলগত অবস্থানের এজন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখানে বিমানবন্দর হলে এই গুরুত্বপূর্ণ সাগরীয় বাণিজ্যিক পথে ভারতের নজরদারিতে সুবিধা হবে। তবে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের জেরে ক্যাম্পবেল বে-তে অবস্থিত নৌবাহিনীর আইএনএস বাজ সম্প্রসারণের দীর্ঘকালের দাবি জোর ধাক্কা খেল।

কেন্দ্রের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে আইএনআস বাজ সম্প্রসারণ সম্ভব নয় পরিকাঠামো, ভূমির রূপ এবং নৌচালনা সংক্রান্ত সমস্যার জন্য। এইসঙ্গে বলা হয়েছে, আইএনএস বাজের রানওয়ে সম্প্রসারণ করতে গেলে জনজাতির আবেগে জোর ধাক্কা লাগবে, এ ছাড়া অরণ্য ও বন্যপ্রাণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। যা প্রস্তাবিত গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে হবে না।
পাঁচ বছরের মধ্যে নিকোবরের গালাথিয়া বে-র কাছে চিংগেনে নতুন বিমাবন্দর তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নৌবাহিনী সহ সাধারণ বিমান যাত্রীদেরও চাহিদা মেটাবে এই বিমানবন্দর। সরকারের বক্তব্য হল এই গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরে ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ করা যাবে এবং ভারতের নজরদারি ক্ষমতা উন্নত করা, নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করবে এই বিমানবন্দর।
গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে চারটি বড় পরিকাঠামো তৈরির করার ভাবনা। যার মোট বাজেট ৮১ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পের কেন্দ্রে রয়েছে গালাথিয়া বে-তে কন্টেনার ট্রানশিপমেন্ট টার্মিনাল তৈরি করা। এর ফলে জাহাজের ট্রানশিপমেন্টের জন্য সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর ওপর নির্ভরতা কমবে ভারতের। বিস্তৃত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি পরিকাঠামো এবং নগর উন্নয়ন, যার লক্ষ্য এই দ্বীপকে প্রধান নৌবন্দর, আর্থিক ও কৌশলগত হাবে রূপান্তর করা।
ভারতের দক্ষিণতম দ্বীপ গ্রেট নিকোবর পৃথিবীর প্রধান আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এই দ্বীপের কাছেই রয়েছে ছয় ডিগ্রি চ্যানেল, যা গিয়েছে মালাক্কা প্রণালির দিকে, যার ওপর দিয়ে বিশ্বের বড় মাপের বাণিজ্যতরী পারপার করে।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ইতিমধ্যে ভারতের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইএনএস বাজ রয়েছে ক্যাম্পবেল বে-তে। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র ত্রি-পরিষেবা কেন্দ্রও রয়েছে এই দ্বীপপুঞ্জে। সামরিক বাহিনী, বায়ুসেনা ও নৌবাহিনীর জন্য আন্দামান ও নিকোবরের গুরুত্ব অপরিসীম।
ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির জন্যই আন্দামান-নিকোবরে ভারতের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা খুব জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মেগা প্রকল্পের বিরোধিতা করেছেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর মতে, এই প্রকল্প আদতে দেশের প্রকৃতি ও জনজাতিদের বিরুদ্ধে বৃহত্তম ষড়যন্ত্র। এই প্রকল্পের ফলে বৃষ্টিচ্ছায় অরণ্য ধ্বংস হবে, কাটা হবে দেড় কোটি গাছ, প্রবাল ধ্বংস হবে এবং বিরল শম্পেন জনগোষ্ঠী লুপ্ত হয়ে যাবে বলে অভিযোগ রাহুল গান্ধীর।তাঁর কথায়, যদি প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে উন্নয়ন জরুরি হয় তাহলে আইএনএস বাজ এয়ারফিল্ড সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বন্দর, বিমানবন্দর, রিসর্ট, টাউনশিপ, হোটেল, রেস্তোরাঁ প্রতিরক্ষার কাজে জরুরি নয়, মত বিরোধী দলনেতার।
প্রকল্পের জন্য পরিবেশ আইন, আর্থিক সমতা, স্বচ্ছতা এবং জনজাতি অধিকারে প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। পরিবেশবিদ, নৃতত্ত্ববিদ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত উপেক্ষা করে প্রকল্প রূপায়ণ করা হবে বলে আশঙ্কা কংগ্রেসর।
রাহুল গান্ধী সহ কংগ্রেসের বিরোধিতা সত্ত্বেও গ্রেট নিকোবর উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে গালাথিয়া বে-র কাছে চিংগেনে নতুন বিমানবন্দরে কেন্দ্রের ছাড়পত্র আরও বিতর্কের জন্ম দেবে।