নেপালের মতো পরিস্থিতি হতে পারে উত্তর-পূর্ব ভারতে?চিনের বিশাল বাঁধ নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের

50

নিউজ ডেস্ক: তিব্বতে তুষারধসের ফলে সৃষ্ট বন্যায় নেপালে অন্তত ১৬৫ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং অন্তত ১৫০০ জন নিখোঁজ। এই বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তের কাছে মেডগ কাউন্টির উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় চিনের নির্মাণাধীন ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বাঁধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
হিমালয় পর্বতমালা নবীন, ক্রমবর্মান এবং একইসঙ্গে অস্থির প্রকৃতির। এবং বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ পর্বতমালা হিমালয়; ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট তুষারধস ও তার জেরে আসা বন্যায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মনে ভারত-চিন সীমান্তের ঠিক পাশেই চিনের মেডগ প্রদেশে বিশাল বাঁধ নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর ৬০,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মেডগ বাঁধ নির্মাণ করছে চিন। ভারতে প্রবেশ করার পর এই নদীই ব্রহ্মপুত্র হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশে ভারত-চিন সীমান্তের কাছেই এই বাঁধ ২০৩৩ সালের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য নিয়েছে বেজিং। এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা এই বিশাল বাঁধকে ‘জল-বোমা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
চিনের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে যে, তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মাণাধীন মেডগ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি সক্রিয় চ্যুতিরেখার (active fault line) ওপর অবস্থিত।
কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানি লিখেছেন, হিমালয় বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ পর্বতমালা, যেখানে অতীতে বহু বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছে। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও কীভাবে ব্যাপক ও ধারাবাহিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তার ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে।


তবে নেপালে হড়পা বান হয়েছে বরফের ধস থেকেই। ভূতাত্ত্বিক ড্যানিয়েল শুগারের বলেছেন, হিমবাহ থেকে প্রায় ২,০০০ ফুট চওড়া বরফের একটি বিশাল খণ্ড পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সেটাই ভোটে কোশি নদীতে বিশাল রূপ নিয়েছে।
নেপালের এই বিপর্যয় বিশেষজ্ঞদের মনে বিশাল মেডোগ বাঁধ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
নেপালে জলপ্রলয়ের পর সমাজমাধ্যমে নিউজউইক গ্লোবাল ও নিউজউইক ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রাক্তন সম্পাদক টুনকু বরদারাজন লিখেছেন, চিন তার ভাটির দিকের সবকিছুর—এবং সবার—মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আক্ষরিক ও রূপক—উভয় অর্থেই। চীন পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় বসতি ও বিভিন্ন পরিকাঠামো গড়ে তুলছে।
চেলানি বলেছেন, নেপালের বিপর্যয় হিমালয়ের ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে চীনের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফের আকর্ষণ করবে।
তিনি আরও বলেন, ভারত-তিব্বত সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই প্রকল্পটি কার্যত একটি জল-বোমা হয়ে উঠছে; এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে প্লাবিত করতে পারে এবং ভাটির দিকে বাংলাদেশেও ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালাতে পারে।
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ রাজীব ডোগরা সতর্ক করেছেন যে, চিনের বিশাল বাঁধের জেরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর চিন যদি ৬০,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল বাঁধ নির্মাণ করে, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে, সমাজমাধ্যমে লিখেছেন রাজীব ডোগরা।
এর আগে চেলানি কেন্দ্রীয় সরকারকে আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ভারত যেন চিনের কাছে দাবি জানায় যে, এই বিশাল বাঁধ প্রকল্পকে ঘিরে যে গোপনীয়তার আবরণ রয়েছে, সেটা যেন চিন সরিয়ে নেয়।


মেডগের বিশাল বাঁধ সক্রান্ত ঝুঁকির বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি হিমালয়ের ভূমিকম্প-প্রবণ বলয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষ ঘটে। এই বলয়টি এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎসস্থল। এর মধ্যে রয়েছে মায়ানমারে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্প, যার কম্পন থাইল্যান্ড পর্যন্ত অনুভূত হয়েছিল এবং এর ফলে ব্যাংককে একটি বহুতল ভবন ধসে পড়েছিল।

মেডগ বাঁধের পরিকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা চিনা বিশেষজ্ঞদের
তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ শুরু করেছে চিন। এই উদ্যোগ ভারত-সহ ভাটির দিকের অঞ্চলে জল নিরাপত্তা, বন্যা ঝুঁকি, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
মোটুও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নামে পরিচিত এই প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন ডলার। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির লোউই ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, নির্মাণকাজ শেষ হলে মেডগ বাঁধ আয়তনের দিক থেকে চিনের থ্রি গর্জেস ড্যাম-কে (যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম) ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিণত হবে এবং এটি বর্তমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে।
চিনের জাতীয় ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার সঙ্গে জড়িত ভূতাত্ত্বিকরা জুলাই মাসে মেডগ বাঁধের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গবেষকরা ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর অবস্থিত মেডগ বাঁধের ঠিক নীচেই একটি সক্রিয় চ্যুতি বা ফল্ট (Paizhen Fault) শনাক্ত করেছে।

চিনের ইয়ারলুং সাংপো বাঁধ নিয়ে ভারত কেন চিন্তিত?
ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত থেকে অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে সিয়াং নামে পরিচিত হয়; এরপর এটি অসমের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
চিন যে মেডগ বাঁধ নির্মাণ করছে, সেটা ইয়ারলুং সাংপো নদীর একটি বাঁকের মুখে অবস্থিত। যেখানে নদীটি তিব্বতের নামচা বারওয়া পর্বতকে ঘিরে একটি বিশাল ইউ-টার্ন নেয়। নদীটি একটি গভীর গিরিখাত দিয়ে খাড়াভাবে নীচে নেমে আসে, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করে। চিন এই অঞ্চলে পর্যায়ক্রমিক বা ক্যাসকেডিং পদ্ধতিতে পাঁচটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে।
এই প্রকল্পের বিশাল আকার ও অবস্থান ভারতে বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে; কারণ ভাটি অঞ্চলের জনবসতি, কৃষি ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্রহ্মপুত্র নদের উজানের অংশের নিয়ন্ত্রণ চিনের হাতে রয়েছে।
ভারতের উদ্বেগের বিষয় হল বাঁধের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হলে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়বে চিনের। যদিও ব্রহ্মপুত্র নিজের জলের বড় অংশ ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত মৌসুমি বৃষ্টি-পুষ্ট উপনদীগুলো থেকে পায়, তবু ভাটির দেশ হিসেবে ভারত এর প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। তিব্বত থেকে ছাড়া জলের পরিমাণ বা সময়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন অরুণাচল প্রদেশ ও অসমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারী বৃষ্টিপাতের সময় জলাধার থেকে হঠাৎ জল ছেড়ে দিলে ভাটি অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, শুষ্ক মরশুমে দীর্ঘ সময় ধরে জল ছাড়ার পরিমাণ কমিয়ে দিলে তা কৃষি, মৎস্যচাষ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু ২০২৫ সালেই সতর্ক করেছিলেন যে, শিয়াং ও ব্রহ্মপুত্র নদে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। তিনি চিনের বিশাল বাঁধ প্রকল্পকে শিয়াং নদের তীরবর্তী উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবেও অভিহিত করেছেন।
ভারতের উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিশাল বাঁধ আন্তঃসীমান্ত নদীর ওপর বেজিংকে বাড়তি নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে। উভয় দেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর উজানে বড় আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ব্রহ্মপুত্রের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নদীর জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বেজিংকে ভাটির দিকের জলপ্রবাহের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে বলেই ভারতের উদ্বেগ বেশি। জলপ্রবাহের ওঠানামা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি নিয়েও ভারত প্রস্তুতি নিচ্ছে।
উজানের দিকে চিনের বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি মোকাবিলা ও জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে, অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং নদীর ওপর ১১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট বা বহুমুখী প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে ভারত।
ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ নদীর তিব্বতীয় অংশে ঘটনাপ্রবাহের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। একারণেই তথ্য আদান-প্রদান এবং তাৎক্ষণিক জলবিজ্ঞান-সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বুধবার নেপালেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
কাঠমান্ডু-ভিত্তিক সাংবাদিক পরশুরাম কাফলে জানিয়েছেন যে, ভাটির দিকে ধেয়ে আসা বিশাল জলরাশির বিষয়ে বেজিং নেপালকে কোনও সতর্কবার্তা দেয়নি। সমাজমাধ্যমে কাফলে লিখেছেন, আমাদের প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার যৌক্তিক বিষয়গুলোকে নেপাল সবসময়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এসেছে। তবে দুঃখের বিষয়, আমাদের উত্তরের প্রতিবেশী দেশ চিন আমাদের বিষয়টি উল্লেখযোগ্যভাবে উপেক্ষা করেছে। এমন এক ভয়াবহ দুর্যোগের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদের প্রচুর প্রাণহানি ঘটেছে।
তিব্বতি আইনজীবী তেনজিন সেরিং বলেছেন যে, কাঠমান্ডু সম্ভবত এই বিপর্যয়ের জন্য বেজিংকে দায়ী করবে না।
মেডগ বাঁধ প্রকল্প নিয়ে সেরিং লিখেছেন, নেপাল সম্ভবত এই ভয়াবহ বন্যার জন্য কখনো চিনকে দায়ী করবে না। দক্ষিণ তিব্বত অঞ্চলে বিশাল এক বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে চিন ভারতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে।
ভারত ও চিনের মধ্যে জলবণ্টনের পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না থাকা, যার আওতায় রিয়েল-টাইম জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব, মেডোগ বাঁধ সংক্রান্ত সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল বাঁধের বিশাল আকার এবং ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে এর অবস্থান।
বিশেষজ্ঞরা মেগ বাঁধকে একটি জল-বোমা হিসেবে অভিহিত করছেন; আর নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দেয়, যা এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য তৈরি করতে পারে চিন।