ভারতে আসছে ‘সুপার এল নিনো’!

14

নিউজ ডেস্ক: এবছর সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’-র আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিক পূর্বাভাস হল, সুপার এল নিনো প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত দেখা দিতে পারে এবং ভারত সহ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে ঘটে থাকে। এই উষ্ণতা আবহাওয়া ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। এল নিনো নামটি এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘দ্য লিটল বয়’ থেকে, যা বহু শতাব্দী আগে পেরুর জেলেরা বড়দিনের সময় সমুদ্রের জল উষ্ণ হতে দেখে বলেছিল।
এই ঘটনাটি সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ঘটে এবং এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। যদিও এর উৎপত্তি প্রশান্ত মহাসাগরে, কিন্তু এর পরিণতি বিশ্বব্যাপী।

‘সুপার এল নিনো’ হলো একই জলবায়ুগত ঘটনার একটি চরম রূপ। এটি শুরু হলে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়, যা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে।

অতীতের সুপার এল নিনোর ফলে তীব্র খরা, বিধ্বংসী বন্যা, ফসলহানি, দাবানল এবং রেকর্ড-ভাঙা তাপপ্রবাহের দেখা গিয়েছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৬ সালে এল নিনো শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা বাড়ছে। এর আগে এল নিনো দেখা গিয়েছিল ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালে।

প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি দ্রুত তৈরি হচ্ছে এবং বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এই ঘটনাটি একটি “শক্তিশালী” বা “অত্যন্ত শক্তিশালী” রূপ নিতে পারে। এখনই সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি, যা এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার একটি প্রাথমিক সূচক।

ভারত কৃষির জন্য ঐতিহাসিকভাবেই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর উপর নির্ভরশীল। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে দেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয়। এল নিনো যখন শক্তিশালী হয়, তখন এটি উপমহাদেশ জুড়ে বৃষ্টি বহনকারী মৌসুমী বায়ুকে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়।

ভারতে বেশ কয়েকটি বড় খরাও এল নিনোর সঙ্গে একই সময়ে ঘটেছে। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, বিকাশমান এল নিনো ২০২৬ সালের মৌসুমী বায়ুকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং বেশ কয়েকটি অঞ্চলে খরা পরিস্থিতির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট দুর্বল মৌসুমি বায়ু ভারতের কৃষি ক্ষেত্রের জন্য অন্যতম বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কম বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘ শুষ্ককাল কৃষি উৎপাদন কমাতে, মাটির আর্দ্রতা নষ্ট করতে এবং সেচের উপর নির্ভরতা বাড়াতে পারে, যা জলবায়ুগত অনিশ্চয়তার সঙ্গে কৃষকদের খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়। এল নিনোর বছরগুলিতে বৃষ্টিপাতের ঘাটতির কারণে ধান, ডাল, আখ এবং তৈলবীজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ফসলগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ফসলের উৎপাদন কম হলে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, বিশেষ করে চাল, ডাল, শাকসবজি এবং ভোজ্য তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাঙ্ক ও এডিবি-র জলবায়ু পরিবর্তন পরামর্শদাতা এস এন মিশ্র বলেছেন, ভারতের ৫০ শতাংশেরও বেশি কৃষি জমি এখনও বৃষ্টি-নির্ভর, যা সুপার এল নিনো-জনিত দুর্বল বর্ষার কারণে কৃষিক্ষেত্রকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এ ছাড়া, সেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়ক জলাধারগুলো অপর্যাপ্তভাবে পূর্ণ হলে তা রবি মরশুমে খাদ্য উৎপাদনকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। কৃষি উৎপাদন কম হলে তা অনিবার্যভাবে খাদ্যমূল্যের উপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করবে এবং মুদ্রাস্ফীতিতে ভূমিকা রাখবে।

অতীতের এল নিনো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে এর ফলে ক্ষতি কতটা মারাত্মক হতে পারে। ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনোর সময় ভারতের বর্ষার বৃষ্টিপাত দীর্ঘকালীন গড়ের ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছিল, যার ফলে বেশ কয়েকটি রাজ্যে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

এল নিনো তাপমাত্রাও বাড়িয়ে দেয়, যা ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিডের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। একই সময়ে, দুর্বল মৌসুমী বায়ু নদী এবং জলাধারগুলির জলের স্তর কমিয়ে দেয়, যেগুলোর উপর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি নির্ভরশীল। এর ফলে, চরম তাপপ্রবাহের সময় শীতলীকরণের চাহিদা বাড়ার কারণে দেশের শক্তি ব্যবস্থার উপর চাপ আরও বৃদ্ধি পায়।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইতিমধ্যে টানা পাঁচ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে এই অঞ্চলে গত ১২৫ বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন বর্ষার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। বৃষ্টিপাত আরও কমলে উত্তর-পূর্ব ভারতে কৃষি ও চা উৎপাদন, জলসম্পদ, গ্রামীণ এলাকায় জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। প্রসঙ্গত, ১৮৭৭ সালে এল নিনোর ভয়ানক প্রভাবে ভারতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।