রাতভর টানা বৃষ্টি, কৃত্রিম বন্যায় বিপর্যস্ত বরাক

75

ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত বরাক উপত্যকার তিন জেলা। কৃত্রিম বন্যায় (ARIFICIAL FLOOD) ডুবল বরাকের প্রাণকেন্দ্র শিলচর শহর। সীমান্ত জেলা শ্রীভূমি শহরেও ভয়াবহ পরিস্থিতি। পাঁচগ্রামে পাহাড়ের প্লাবনে ভেঙে গেল আরসিসি ব্রিজ। পাঁচগ্রামে রেললাইনে ধস।

শিলচরের ছবি। শুক্রবার।

রাতভর কৃত্রিম বন্যায় ডুবল শিলচর

টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত ডিমাহাসাও সহ বরাক উপত্যকার তিন জেলা। বৃহস্পতিবার রাতভর বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত বরাক উপত্যকার তিন জেলা। এই দৃশ্য শিলচর শহরের। অধিকাংশ এলাকায় জমা জলে নাকাল শহরবাসী। বিশেষ করে বিলপার, রাধামাধব রোড, বিবেকানন্দ রোড, লিংক রোড, আশ্রম রোড সহ শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কৃত্রিম বন্যার কবলে। প্লাবিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, মানুষের ঘরবাড়ি। একদিকে ভারী বৃষ্টিপাত, অন্যদিকে বেহাল জলনিকাশী ব্যবস্থা। ফলে গোটা শহরজুড়ে অভাবনীয় পরিস্থিতি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরে রাজপথে নামেন নবনির্বাচিত বিধায়ক ডাঃ রাজদীপ রায়। তিনি শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থায় কোথায় কী সমস্যা রয়েছে তা খতিয়ে দেখেন। শীঘ্রই শহরের এই সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতিও দেন।

বদরপুরে উদ্ধার অভিযানে নামল SDRF

রেল শহর বদরপুরেও ভয়াবহ পরিস্থিতি। ভারী বর্ষণে রেল কলোনির বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। কোথাও কোথাও মানুষের ঘরে বুক জল। খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযানে নামে SDRF-এর জওয়ানরা। বহু উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসেন তারা। ভারি বর্ষণে বিপর্যস্ত কাটিগড়ার বিভিন্ন এলাকা। কাটিগড়া চৌরঙ্গীতে জাতীয় সড়ক ডুবে যায় কৃত্রিম বন্যায়। ভারতমালা প্রকল্পের কাজের জন্য ওই এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড়ের মাটি কেটে ফেলায় পাহাড়ের জল সরাসরি জাতীয় সড়কে নেমে আসে। ফলে চৌরঙ্গী এলাকার মানুষ জলমগ্ন হয়ে পড়েন।

ধলেশ্বর-পেদলাপুঞ্জি পূর্ত সেতু, পাঁচগ্রাম

পাঁচগ্রামে ভেঙে গেল আরসিসি সেতু

হাইলাকান্দির পাঁচগ্রামে পাহাড়ি প্লাবনে ভেঙে গেল একটি আরসিসি সেতু। ধলেশ্বর – পেদলাপুঞ্জির মধ্যে থাকা এই সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ। রাতভর বৃষ্টিতে ধস নামল পাঁচগ্রাম রেল স্টেশনের কাছে। ফলে বদরপুর-শিলচর রুটে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় রেল পরিষেবা। শিলচরগামী অধিকাংশ ট্রেন আটকে রাখা হয় বদরপুরে। শুক্রবার সকালেই ধস সারাইয়ের কাজে নামে রেলবিভাগ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রেল পরিষেবা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

শ্রীভূমি শহরে ভয়াবহ পরিস্থিতি

টানা বৃষ্টিতে কৃত্রিম বন্যায় (ARIFICIAL FLOOD) ডুবল শ্রীভূমি শহর। শহরের অধিকাংশ এলাকা জলের তলায়। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি শহরের ব্রজেন্দ্র রোড এলাকায়। রাস্তার উপর প্রায় কোমর জল। কৃত্রিম বন্যায় বিপর্যস্ত সীমান্ত শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শহরের অধিকাংশ এলাকা জলের তলায়। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি শহরের ব্রজেন্দ্র রোড এলাকায়। রাস্তার উপর প্রায় কোমর জল। মেন রোড, মিশন রোড, নীলমণি রোড, ব্রজেন্দ্র রোড, পিডব্লুউডি কর্নার, থানা রোড, ডিসি বাংলো রোড সহ একাধিক এলাকা ভেসে গেছে কৃত্রিম বন্যায়। শ্রীভূমি শহরের রামকৃষ্ণ মিশনও এবার ডুবল কৃত্রিম বন্যায়। মিশন চত্বরের ভেতরে হাঁটুজল। যে এলাকার মানুষ কোনও দিন জল দেখেননি, সেই সব এলাকার মানুষ এই মুহূর্তে জলে সাঁতার কাটছেন। শহরের রাজপথে ঘুরছে SDRF-এর রবারের নৌকা।

কৃত্রিম বন্যা
বন্যার্তদের খোঁজ নিচ্ছেন বিধায়ক জাকারিয়া আহমেদ পান্না

বন্যার্তদের খোঁজ নিলেন বিধায়ক জাকারিয়া আহমেদ

কেন এই কৃত্রিম বন্যা? তা সরেজমিন খতিয়ে দেখেন উত্তর করিমগঞ্জের নবনির্বাচিত বিধায়ক। হিন্দু নেতাদের যখন সন্ধান নেই, তখন একজন মুসলিম বিধায়ক হিন্দু এলাকার পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে মানুষের খোঁজ নিচ্ছেন। মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিচ্ছেন। প্রশ্ন হয়, শ্রীভূমি শহরের এই কৃত্রিম বন্যার জন্য কে দায়ী? এ ব্যাপারে শ্রীভূমি পুরসভাকে সরাসরি দায়ী করেছেন বিধায়ক জাকারিয়া আহমেদ পান্না। তিনি বলেন, ‘বর্ষার আগে পুরসভা কোনও কাজ করেনি। তাই এই বিপর্যয়।’

থানা রোডে যুবকের মৃত্যু

এই দুর্যোগের মধ্যে শহরের থানা রোডে ঘটল মর্মান্তিক ঘটনা। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেলেন এক যুবক। নিহত যুবকের নাম মনতোষ দাস। বাড়ি উত্তর করিমগঞ্জ বিধানসভার অন্তর্গত সাদারাশি গ্রামে। সূত্রের খবর, থানা রোড দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বিদ্যুৎ পরিবাহী তারের সংস্পর্শে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। পরে পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা এসে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠান। কীভাবে মনতোষের মৃত্যু হল, কারণ খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কবে ‘শ্রী’ পাবে শ্রীভূমি?

বিজেপির দৌলতে করিমগঞ্জ নাম বদলে শ্রীভূমি হয়েছে। কিন্তু শ্রীভূমিতে নেই ‘শ্রী’। বেহাল রাস্তাঘাট। সেই সঙ্গে রয়েছে কৃত্রিম বন্যার সমস্যা। এক পসলা ব্ষ্টি হলেই ডুবে যায় শ্রীভূমি শহর। এরজন্য মূলত দায়ী শহরে জলনিকাশি ব্যবস্থা। শ্রীভূমি শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছিল কংগ্রেস আমলেই। তখন দেবর্ষি ভট্টাচার্য ছিলেন পুরপতি। ৫ কোটি টাকার মাস্টার ড্রেনেজ প্রকল্পে হয়েছিল হরির লুট। সেই সময়েই নালাগুলো ছোট করে দেওয়া হয়। এরপর করিমগঞ্জ পুরসভা আসে বিজেপির দখলে। কিন্তু শহরের কৃত্রিম বন্যা সমস্যার সমাধানে কার্যত গুরুত্ব দেয়নি পুরসভা। শহর থেকে জল বের হওয়ার পথ নেই। অবৈধ নির্মাণ, বেদখল আরও শোচনীয় করে তুলেছে শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থাকে। প্রশ্ন হয়, কবে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে শ্রীভূমি শহর? শাসকদলের নেতারা কি উদ্যোগ নেবেন?