দু’দশকের ‘লজ্জা’ কাটল, রবীন্দ্র সদনে কবিতা পাঠ তসলিমা নাসরিনের

37

পৃথা দাশগুপ্তকলকাতা:কলকাতার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রবীন্দ্রসদনে বিখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে স্বাগত জানালেন শহরবাসী। আজ সন্ধ্যা ছিল আবেগের। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি ও স্বাগত ভাষণে অনুষ্ঠান বাড়তি মাত্রা যোগ হল।

রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান শুভেন্দু অধিকারী স্বাগত ভাষণে বলেন, ‘‘সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর। আপনি যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা আসবেন, কথা বলবেন। শৃঙ্খলামুক্ত, বাঁধনমুক্ত পশ্চিমবঙ্গে সবার আসার, বাক স্বাধীনতার সুযোগ আছে। ধমক-চমক অতীত। আজ প্রমাণিত, নতুন সরকারের হাতে বাংলার গণতন্ত্র, সংবিধান, মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা সুরক্ষিত।”

কলকাতায় ‘ফেরা’ অনুষ্ঠিত হল সেক্যুলার মিশনের উদ্যোগে। আজ সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসদনে সেই উদযাপনের অপেক্ষায় ছিল গোটা শিল্প জগত।

লেখিকাকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা । তুঁতে বালুচরী, লাল টিপে বাংলার মেয়ের মুখেও তখন প্রশান্তির বিচ্ছুরণ, চোখে জল, নস্টালজিয়া । মঞ্চে তসলিমাকে স্বাগত জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দেওয়া হয় নাগরিক সংবর্ধনা। সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি ছবি তুলে দেওয়া হয় লেখিকার হাতে। এরপর ‘দ্বিখণ্ডিত’ স্রষ্টার ছবি খোদাই করা একটি রুপোর মেডেল নাগরিকদের তরফে উপহার হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী।

এরপর সংক্ষিপ্ত ভাষণ মুখ্যমন্ত্রীর। তিনি বলেন, ‘‘শৃঙ্খলমুক্ত, বাঁধনমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ। সবার এখানে আসার, সবার বাক স্বাধীনতার সুযোগ রয়েছে। আমাদের প্রিয়, সম্মানীয়া লেখিকা বঙ্গভূমিতে পা রেখেছেন। তাতেই প্রমাণিত, নতুন সরকারের হাতে বাংলার গণতন্ত্র, সংবিধান, মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা সুরক্ষিত। কোনও ধমক-চমক নয়। সেসব এখন অতীত। নতুন সরকারে শুধু মুখ বদল হয়নি। আরও অনেক বদল হয়েছে। তসলিমা নাসরিন সেসব ভালোই বুঝতে পেরেছেন আশা করি। ওঁকে বলতে চাই, আপনি যতবার খুশি, যখন খুশি আসুন। সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর।” তসলিমা নাসরিনের জন্য কবিতা লিখেছেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, সেই কবিতা তিনি পড়ে শোনান।

আবেগপ্লুত সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা রাখতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ঝড়ে পড়ে একরাশ আক্ষেপও। তিনি বলেন, “কলকাতায় ফিরেছি, একথা বলতেই দুই দশক লেগে গেল। একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে আসতে পুলিশের সাহায্যের প্রয়োজনটাই বেদনার।” কলকাতায় ফিরতে পারায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান লেখিকা। একইসঙ্গে অগস্টকে প্রত্যাবর্তনের মাস বলেও উল্লেখ করলেন।

আজ রবীন্দ্র সদনে তসলিমা নাসরিনের বই ‘আত্মজীবনী সমগ্র’ প্রকাশিত হয়। মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তসলিমা বলেন, “নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কোনও রাজনৈতিক দলের কথা বলতে আসিনি। বাক স্বাধীনতার কথা বলতে এসেছি। আমি কলকাতায় এসেছি ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতে। ভয় চিরস্থায়ী নয়, নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী নয়। বন্ধ দরজা চিরকাল বন্ধ থাকে না। অগস্ট আমার জন্মের মাস, নির্বাসনের মাস, আজ থেকে অগস্ট প্রত্যাবর্তনের মাস।”

বাংলাদেশ তাঁর হৃদয়েই , বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আমার ভিতর থেকে দেশকে সরাতে পারেনি। এক বাংলায় আমার জন্ম আরেক বাংলায় ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। বাংলাকে কোনোদিন এপার ওপার বলে ভাবিনি। কাঁটাতার ভূখণ্ডকে ভাগ করতে পারে, ভাষাকে নয়। আমার বই দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ হয়েছিল, হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।”

বাংলাদেশে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ”আমার দেশ বাংলাদেশ আমাকে শাস্তি দিয়েছিল। আমি কি কাউকে হত্যা করেছিলাম? সারা দেশে আমাকে হত্যার জন্য মিছিল বের হল। রাষ্ট্র আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করল, আমাকে বের করে দিল। আমার নির্বাসন কোনও ব্যক্তিগত বিষয় নয়। আইনের শাসনের নির্বাসন।”

তসলিমার কথায়, “ধর্মের মর্যাদার চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড়। ভারত বাংলাদেশ দুই দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার। বাংলাদেশে আজ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অবস্থা ভয়াবহ।” কলকাতায় প্রত্যাবর্তন নিয়ে বলেন, “আমাকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আমি কোনও অপরাধ করিনি। তাও শাস্তি দিয়েছিল। চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মধ্যে ১৯ বছর কেউ আমায় ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কলকাতায় ফেরা আমার ব্যক্তিগত বিষয় নয়, নির্বাসনের বিরুদ্ধে জয়।”