১০ মাসে ১৪ আপত্তি, কিন্তু যৌথ ব্রিফিং মাত্র ৫!

26

নিউজ ডেস্ক: গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বেশ কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দুই নির্বাচন কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানালেও, গুরুত্বপূর্ণ সব ব্রিফিংয়ে তিন সদস্যের এই প্যানেল জনসমক্ষে ঐক্যবদ্ধ ভাবমূর্তি বজায় রেখেছিল। ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ থেকে ১৪ আগস্ট, ২০২৬— যে সময়কালে নির্বাচন কমিশনাররা এসআইআর প্রক্রিয়া-সহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন, সেই সময়ে কমিশন চারটি যৌথ ব্রিফিং করে এবং গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন (IICDEM)-এর আয়োজনও করে।
তবে ওই ব্রিফিংগুলোয় নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী তাঁদের ক্ষোভ বা ভিন্নমতের কথা প্রকাশ করেননি। নতুন ভোটার তালিকাভুক্ত করা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল, ভোটার-সংক্রান্ত আদেশের বিরুদ্ধে আপিল এবং ভোটার-সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার বা ডেটা সংরক্ষিত থাকে এমন ইসিআই সফটওয়্যারে প্রবেশের অধিকার— এসব বিষয়ে সান্ধু ও জোশী আপত্তি জানিয়েছিলেন।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব আপত্তির অনুলিপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, তিনি বর্তমানে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

গত ১০ মাসে ৫ বার যৌথ উপস্থিতি
অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন আপত্তি সত্ত্বেও, তিনজন কমিশনার নির্বাচন-সংক্রান্ত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিংয়ে— ২৭ অক্টোবর, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১০ মার্চ এবং ১৫ মার্চ— একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর, নির্বাচন কমিশন ১২ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে এসআইআর-এর দ্বিতীয় পর্যায় ঘোষণা করে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন এবং সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন কমিশনার সান্ধু ও জোশী। এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ, কেরলম ও তামিলনাড়ুর মতো আসন্ন নির্বাচনের রাজ্যগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নির্বাচন কমিশন অসমকে এর বাইরে রাখে, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যুক্তি দেন যে, অন্যান্য রাজ্যের জন্য প্রযোজ্য এসআইআর-এর নিয়ম অসমের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়; কারণ নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওই রাজ্যের মানদণ্ড ভিন্ন।
ঠিক পরের দিনই (২৮ অক্টোবর) সান্ধু নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কমিশনের নামে চিঠি ও নির্দেশিকা জারি করার বিষয়ে আপত্তি জানান। তবে ঠিক কোন নির্দেশিকার কথা বলা হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।

সফটওয়্যার চালুর আগেই আপত্তি
নির্বাচন কমিশনাররা আরেকটি উদ্বেগ করেছিলেন যে, রাজ্য-স্তরের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জন্য ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ডেটাবেস ‘ইআরওনেট’ (ERONet)-এর ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনী নিবন্ধন কর্মকর্তারা (ইআরও বা EROs) ডেটাবেসে ভোটারদের নাম যুক্ত করা, বাদ দেওয়া বা পুনর্বহালের কাজে ইআরওনেট ব্যবহার করে আসছেন। ব্যবস্থাটি বিকেন্দ্রীভূত রাখা হয়েছিল যাতে ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের বিষয়টি নির্বাচন কমিশন কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগের মহাপরিচালক বা ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্না এই সফটওয়্যারটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর, উপ-নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমার প্রথম বিষয়টি সামনে আনেন যে ইআরওদের এই সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে। সান্ধুর নির্দেশে সঞ্জয় কুমার এবিষয়ে খান্নার কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
নির্বাচন-সংক্রান্ত সমস্ত পোর্টালকে এক ছাতার নীচে নিয়ে আসার লক্ষ্যে কমিশন যখন ‘ইসিআইনেট’ (ECINet) নামে একটি নতুন ও উন্নত সংস্করণ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তার কয়েক সপ্তাহ আগেই এই উদ্বেগের বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি খান্নাকে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়; তখন ১২টি রাজ্যে ভোটার তালিকা এসআইআর প্রক্রিয়া পুরোদমে চলছিল। ওই চিঠিতে কুমার খান্নাকে অনুরোধ জানান যেন আইটি ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয় যা ইআরও-দের বিধিবদ্ধ অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে।
এর বিশ দিন পর, দিল্লির আইআইসিডিইএম (IICDEM)-এ তিন নির্বাচন কমিশনার যৌথভাবে ‘ইসিআইনেট’-এর উদ্বোধন করেন। কিন্তু এর কয়েক মাস পরেই দুই নির্বাচন কমিশনার ভোটার তালিকা ডেটাবেসের ক্রমশ ‘কেন্দ্রীভূত’ হয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান। এ ছাড়া, সীমা খান্নার আইটি বিভাগের মাধ্যমে যেসব নতুন মডিউল ও পোর্টাল তৈরি করা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে তাঁকে অন্ধকারে রাখার অভিযোগও তোলেন সান্ধু।

মার্চ মাসে সর্বশেষ যৌথ উপস্থিতি
এরমধ্যে, তিনজন নির্বাচন কমিশনার তিনটি যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। প্রথমটি হয়েছিল এবছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি গুয়াহাটিতে, অসমে নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে। তিন দিনের সফরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকের পর এই ব্রিফিংটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে জ্ঞানেশ কুমার অসমে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া (Special Revision) সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
নির্বাচন কমিশনাররা দ্বিতীয়বার একত্রিত হয়েছিলেন ১০ মার্চ কলকাতায়। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে ৬০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনায় সৃষ্ট ব্যাপক বিতর্কের মধ্যেই এই ব্রিফিংটি হয়েছিল।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ভোটার তালিকার বিশুদ্ধতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও, যেসব নামের বিষয়ে আপত্তি বা সংশয় রয়েছে সেগুলো নিষ্পত্তির সময়সীমা সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনও উত্তর দেননি। জ্ঞানেশ কুমার জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, কোনও যোগ্য ভোটারই তালিকা থেকে বাদ পড়বেন না।
তবে, কয়েক মাস পরে নির্বাচন কমিশনার সান্ধু উল্লেখ করেন যে, বাংলায় ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে ট্রাইব্যুনালগুলোতে ১৬ লক্ষ আবেদন দায়ের করা হয়েছিল। আগস্ট মাসে সান্ধু কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এই আবেদনগুলো দায়ের করার অনুমোদন কে দিয়েছিলেন।
সান্ধু জানতে চেয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের তরফে এই আবেদনগুলো দায়ের করার জন্য কাকে এবং কার দ্বারা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল?
তৃতীয় ও সর্বশেষ যৌথ সংবাদ সম্মেলনটি হয়েছিল ১৫ মার্চ নয়াদিল্লিতে; সেদিন নির্বাচন কমিশন অসম, কেরলম, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ এবং পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছিল। এখানেও সান্ধু ও জোশি উপস্থিত ছিলেন এবং ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রদর্শন করেছিলেন।
তবে, কমিশনের অভ্যন্তরে এসআইআর এবং ECINet সফটওয়্যার নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত ছিল।

নির্বাচন কমিশন কী বলেছে?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনের জবাবে নির্বাচন কমিশন ওই ১৪টি নোটের অস্তিত্ব, তারিখ বা বিষয়বস্তু নিয়ে কোনও দ্বিমত পোষণ করেনি।
তবে কমিশন এই পর্যবেক্ষণগুলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে অভিহিত করেছে। নির্বাচন তদারককারী সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে যে, গত ১০ মাসে ইসিআই যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সবই ছিল সর্বসম্মত।
ইসিআই-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১০ মাস ধরে নেওয়া অসংখ্য অনুমোদন, সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা ও উদ্যোগের বিশাল পরিসরকে উপেক্ষা করে কেবল নির্দিষ্ট কিছু অভ্যন্তরীণ নোটকে তুলে ধরা হলে তা পরিস্থিতির খণ্ডিত চিত্রই কেবল তুলে ধরে।