প্রয়াত নানা পাটেকর

47

নিউজ ডেস্ক: প্রয়াত নানা পাটেকর, বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তীব্র বুকে ব্যথার পর গোয়ার ফ্ল্যাটে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নানার ছেলে ছেলে মলহার পাটেকর বলেছেন, তীব্র বুকে ব্যথা শুরু হওয়ার পর একটি মেডিক্যাল টিমকে ডাকা হয়েছিল। তখনই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। নানাকে মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা চালান। কিন্তু শেষপর্যন্ত নানাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
পুনেতে নানার খামারবাড়িতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আশিস শেলার জানিয়েছেন যে, নানা পাটেকরকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হবে।

নানা পাটেকারের শেষ মুহূর্ত
মণিপাল হাসপাতালের ডাক্তার শেখর সালকার বলেছেন, হাসপাতালে আনার আগেই নানা পাটেকারের মৃত্যু হয়েছিল। ভোর সাড়ে চারটেয় তাঁকে আনা হয় এবং ৫টা ৩০ মিনিটে মৃত ঘোষণা করা হয়। আমরা তাঁকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। রাত আড়াটাই তিনি কাউকে ফোন করেছিলেন। এক বন্ধুকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে অসুস্থ বোধ করছেন। গভীর রাত হওয়ায় বন্ধুটি বার্তাটি দেখতে পাননি, তাই তিনি তাঁকে ফোন করেন। এরপর ভোর ৪টার দিকে তিনি নানার বাড়িতে যান।
তিনি যোগ করেন, ততক্ষণে নানার শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল এবং তিনি ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। তাঁরা প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো নেন এবং এরপর তাঁর কেয়ারটেকারকে পাঠান, কারণ তাঁরা আমাদের হাসপাতালের কাছেই থাকতেন। কেয়ারটেকার হাসপাতালে এসে আমাদের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যান। আমাদের মেডিক্যাল টিম সেখানে গিয়ে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ শুরু করে, কিন্তু বাঁচানো যায়নি নানা পাটেকরকে।

নানা পাটেকরের শেষ কর্মসূচি
প্রবীণ এই অভিনেতাকে শেষবার জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল ৪ অক্টোবর গোয়ার ডোনা পাওলায় ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর অভিষেক অনুষ্ঠানে। সেখানে নানা বলেছিলেন, আমাদের সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। আমি জানি না আগামীকাল আমি বেঁচে থাকব কি না। প্রতিটি মানুষের জীবনই শেষ পর্যন্ত সেই পরিণতির মুখোমুখি হয়। কিন্তু তার আগে আমাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে: আমি কি সেই কাজগুলো করতে পারছি যা আমি করতে চাই?

নানা পাটেকরের অবদান
নাটক ও চলচ্চিত্রের জগতে পা রাখার আগে নানা পাটেকর মুম্বাইয়ের স্যার জে. জে. স্কুল অফ আর্টে পড়াশোনা করেছেলন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় তাঁর অভিষেক ঘটে। হিন্দি ও মারাঠি— উভয় ভাষার ছবিতেই নানা ছিলেন সাবলীল। আজ কি আওয়াজ, প্রতিঘাত, মোহরে ও ত্রিশাগ্নি-র মতো ছবিতে কাজের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে এমন একজন অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যিনি যেকোনো চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করতে সক্ষম।
অঙ্কুশ (১৯৮৬) চলচ্চিত্রটি তাঁর ক্যারিয়ারে গতি সঞ্চার করলেও, বিধু বিনোদ চোপড়ার পরিন্দা (১৯৮৯) ছিল তাঁর অভিনয়-জীবনের এক বড় মোড়। এই ছবিতে তিনি ‘আন্না’ নামের এক উগ্র মেজাজের গ্যাংস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং অনবদ্য অভিনয়ের জন্য ‘সেরা পার্শ্ব-অভিনেতা’ হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। পাশাপাশি তিনি ‘সেরা পার্শ্ব-অভিনেতা’র জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও অর্জন করেন।

ক্রান্তিবীর, অগ্নি সাক্ষী
নব্বইয়ের দশকটি হিন্দি সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অভিনেতা হিসেবে পাটেকরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অঙ্গার (১৯৯২) ছবির জন্য তিনি সেরা খলনায়কের ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন এবং এরপর তিরঙ্গা (১৯৯৩) সিনেমার মাধ্যমে আরেকটি বড় সাফল্য পান। ক্রান্তিবীর (১৯৯৪) সিনেমায় অগ্নিমূর্তি প্রতাপ নারায়ণ তিলকের চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার— উভয়ই এনে দেয়।
এরপর তিনি অভিনয় করেন অগ্নি সাক্ষী (১৯৯৬) সিনেমায়, যার জন্য তিনি তাঁর তৃতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারটি (এবার পার্শ্ব-অভিনেতা হিসেবে) জয় করেন। এই সময়েই তিনি খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল-এর মতো চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।

আব তক ছাপ্পান থেকে ওয়েলকাম
২০০০-এর দশক জুড়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে পাটেকর এক গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি বজায় রেখেছিলেন। আব তক ছাপ্পান (২০০৪) সিনেমায় তিনি সাধু আগাশে নামের এক কঠোর মুম্বাই পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করেন, এই চরিত্রটি অন্যতম প্রশংসিত একটি অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
অপহরণ (২০০৫) সিনেমায় নৈতিকভাবে জটিল এক রাজনীতিবিদের চরিত্রেও তিনি সমানভাবে সফল ছিলেন এবং সেরা খলনায়ক হিসেবে আরেকটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জয় করেন।
ওয়েলকাম (২০০৭) সিনেমায় গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে অভিনয় তাঁকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে মূলধারার বিশাল এক দর্শকগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরে। পরবর্তীতে ওয়েলকাম ব্যাক (২০১৫) সিনেমাতেও তিনি একই চরিত্রে অভিনয় করেন। দুটিই ছিল কমিক চরিত্র।

নাটসম্রাট ও মারাঠি চলচ্চিত্র
হিন্দি চলচ্চিত্রের একজন বড় তারকা হয়ে উঠলেও, মারাঠি চলচ্চিত্র নানা পাটেকরের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
তাঁর অন্যতম প্রশংসিত কাজ ছিল মারাঠি চলচ্চিত্র নাটসম্রাট (২০১৬)-এ। এই ছবিতে তিনি অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চ-অভিনেতার চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি বার্ধক্য, পারিবারিক বিষয় এবং আপনজন হারানোর বেদনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার (মারাঠি) ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান।

তামিল চলচ্চিত্রে নানা পাটেকর
নানা তামিল চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। ভারতী রাজার বোম্মালট্টম ছবিতে এবং এরপর রজনীকান্তের কালা (২০১৮) ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।
দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে নানার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে কালা ছবিটি অন্যতম।

নানা পাটেকর কেবল একজন অভিনেতাই ছিলেন না। ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রহার ছবিতে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই ছবিতে তিনি প্রধান চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন।
২০১৫ সালে তিনি এবং সহকর্মী মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরে নাম ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থাটি কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের খরা-কবলিত এলাকার কৃষকদের কল্যাণে কাজ করে।
নানা পাটেকরের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে বনবাস, হাউসফুল ৫ এবং ২০২৬ সালে মুক্তিপ্রত্যাশী ও রোমিও এবং সুবেদার ।