নিউজ ডেস্ক: তিন বছর হয়ে গেল মণিপুরে হিংসা থামার কোনও বিরাম নেই। কাংপোকপি, সেনাপিত, উখরুলে চলছে নাগাও কুকি গোষ্ঠীর সংঘর্ষ। ২০২৩ সালের ৩ মে শুরু হয়েছিল মৈতেই-কুকি সংঘর্ষ। পরিস্থিতি এমনই যে মৈতেই অধ্যুষিত ইম্ফল উপত্যকা ও কুকি অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকায় বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর কেউ থাকে না।
৩ বছর আগে যখন মৈতে-কুকি সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল, নাগারা কোনও পক্ষেই যোগ দেয়নি। সংঘর্ষ মূলত সীমাবদ্ধ ছিল মৈতেই-কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথমদিকে পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয় কুকিদের সঙ্গে নাগাদের সংঘর্ষ।
এবছর ৭ ফেব্রুয়ারি উখরুল জেলার লিটন সারেইখং গ্রামে প্রথম নাগা-কুকি সংঘর্ষের খবর আসে। দুটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে বিষয়টি বেশি দূর গড়ায়নি। কিন্তু দুপক্ষের মধ্যেই তখন থেকে অশান্তির বীজ রয়ে যায়। এরপর নাগা-কুকি সংঘর্ষে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
১৩ মে চূড়াচান্দপুর জেলার তিন থাডৌ চার্জ নেতার সঙ্গে তাঁদের গাড়ির চালককেও হত্যা করা হয়। দুটি গাড়িতে তাঁরা কোটলেন থেকে যাচ্ছিলেন কোটজিম গ্রামে। এই ঘটনায় কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র রোষের সঞ্চার হয়। কুকিরা সরাসরি এই হত্যায় নাগাদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করে।
.
চার্চ নেতাদের হত্যার পর নাগা-কুকি সংঘর্ষ নতুন মোড় নেয়। সেনাপতি জেলা থেকে ২৮ জন কুকিকে অপহরণ করা হয় আর উলটোদিকে কাংপোকপি জেলার লেইলোন ভাইফেই গ্রাম থেকে ২০ জন নাগাকে অপহরণ করা হয়।
অপহরণের একদিন পর, ১৪ মে, আলোচনার পর দুপক্ষই ১৪ জন করে অপহৃতে মুক্তি দেয়। যদিও ১৪ কুকি ও ৬ নাগা তারপরও অপহৃত হিসেবেই থেকে যায়।
২৫ দিন পর, ৮ জুন, বাকি ১৪ জন অপহৃত কুকিকে ছেড়ে দেয় নাগারা। কিন্তু ৬ জন অপহৃত নাগাকে তখনও মুক্তি দেওয়া হয়নি।
৯ জুন, কাংপোকপি জেলার লেইলোন ভাইফেই গ্রামে প্রতিরক্ষা বাহিনীর তল্লাশি অভিযানে ৬ নাগার মরদেহ উদ্ধার হয়।
এরপর কুকি অধ্যুষিত এলাকার নাগারা চলে যায় নাগা অধুষ্যিত এলাকায়। ১৭ মে নাগা সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল ২ নং জাতীয় সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। এর ফলে কুকি অধ্যুষিত কাংপোকপি জেলায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

২০২৩ সালের মে মাসে মৈতেই-কুকি সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর ইম্ফল-কাংপোকপি সড়কে কুকি বা মৈতেইদের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কুকিদের আবশ্যকীয় সামগ্রী যেমন জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছিল ২ নং জাতীয় সড়কের ওপর। কিন্তু নাগাদের অবরোধে সেই সড়ক প্রায় ৫০ দিন ধরে বন্ধ। এর ফলে কুকি অধ্যুষিত এলাকায় চাল, রান্নার গ্যাস ও জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া। বর্তমানে কাংপোকপি জেলায় এক বস্তা চালের দাম ৫ হাজার টাকা আর পেট্রল-ডিজেল বিক্রি হচ্ছে লিটার পিছু ২৫০-৩০০ টাকায়।
২০২৩ সালের মে মাসে মৈতেই-কুকি সংঘর্ষ শুরুর পর মণিপুরের বিভিন্ন ত্রাণ শিবিরে বর্তমানে প্রায় ৪৩,০০০ থেকে ৫৮,০০০ বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছে। ১৭৪টি কার্যকরী ত্রাণ শিবিরে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ফলে ৪৩ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও নিজেদের বাড়ি ফিরতে পারেনি এবং মণিপুর সরকারের তথ্য অনুযায়ী এসব ত্রাণ শিবিরে ৭৩১ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।