গুয়াহাটিতে শ্যামাপ্রসাদ সেতু

36

নিউজ ডেস্ক, গুয়াহাটি: পশ্চিমবঙ্গে না থাকলেও গুয়াহাটিতে রয়েছে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সেতু। শুক্রবার ২.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ শ্যামাপ্রসাদ সেতু উদ্বোধন করেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। ৩৭৬ কোটি ব্যয়ে নির্মিত সেতু যোগ করেছে বাঙালি অধ্যুষিত লালগণেশকে কালাপাহাড়ের সাইকেল ফ্যাক্টরিকে। এই এলাকায় দীর্ঘকাল ধরেই যানজট ছিল। আশা করা যায় সেতু নির্মাণের পর যানজট কমবে।
অনেকেই হয়তো আশ্চর্য হবে যে বাংলার ব্যারিস্টার, শিক্ষাবিদ এবং রাজনীতিক শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামে সেতু হয়েছে গুয়াহাটিতে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে ভারতের জনগণ মনে রেখেছে ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে, যে দল এখন পরিচিত ভারতীয় জনতা পার্টি নামে। এ ছাড়া জম্মু কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার প্রবল বিরোধী ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। তাঁর মৃত্যুও হয়েছিল জম্মু কাশ্মীরে পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন।
বাংলার মনীষীর নামে গুয়াহাটিতে সেতু কেন? খুব স্পষ্টভাবে এর উত্তর দিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর অসমকে ভারত রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। সেই সূত্রে অসমের ঋদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হতে না দিয়ে।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে তখন প্রধান প্রশ্ন ছিল কীভাবে নির্ণীত হবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত। ভারত ও পাকিস্তান দুটি দেশ হবে এটা আগেই স্থির হয়ে গিয়েছিল। মহম্মদ আলি জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম লিগ আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল ভারতের পূর্বাঞ্চলকে পূর্ব পাকিস্তানে রাখতে। ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানে প্রস্তাব ছিল অসম ও বাংলা প্রদেশকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার। এই দুটি অঞ্চলকে রাখা হয়েছিল গ্রুপ-সি ক্যাটেগরিতে। যা আদতে ছিল মুসলমান অধ্যুষিত প্রদেশ।
তখন বাংলা তো বটেই অসমেও প্রচুর বাংলাভাষী মুসলমান ছিলেন। যার জেরে বাংলা সহ অসম অন্তর্ভুক্ত হতে পারত পূর্ব পাকিস্তানের। অসম সহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা হয়েছিল ক্যাবিনেট মিশনের বৈঠকে।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন, ১৯৪৭-এ মূল প্রশ্ন ছিল কোথায় টানা হবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত। মুসলিম লিগের পরিকল্পনা ছিল কলকাতা সহ গোটা বাংলা এবং গোটা উত্তর-পূর্বকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার। যদি তারা সফল হত তাহলে আজ আর অসম ভারতের অংশ থাকত না।
সেই সময়ে অসমের স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা প্রথম মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ এই পরিকল্পনার জোরালো বিরোধিতা করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তখন অসমের সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ করেন গোপীনাথ বরদলৈ এবং ব্যক্তিগতভাবে কংগ্রেস হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। আর হিন্দু মহাসভার উজ্জ্বল নেতা হিসাবে জাতীয় রাজনীতিতে বাংলা ও অসম যাতে ভারতের অংশ থাকে সেবিষয়ে দৌত্য করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। উভয়ের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় ক্যাবিনেট মিশনের অসমকে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ করার পরিকল্পনা সাকার হয়নি।
দেশ বিভাজনের সময় অসমের স্বার্থ রক্ষার সঙ্গেই শ্যামাপ্রসাদের দায়িত্ব শেষ হয়নি। ১৯৩৪-৩৮ সময়কালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আঞ্চলিক ভাষায় পঠনপাঠনের তালিকায় স্থান দেন অসমিয়া ভাষাকে। উচ্চশিক্ষায় অসমিয়া ভাষা ব্যবহারের প্রসার ঘটান শ্যামাপ্রসাদ।
এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন স্কুলশিক্ষায় অসমিয়া ভাষা ব্যবহারের সওয়াল করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। অসমিয়া ভাষা অধ্যয়ন এবং উচ্চশিক্ষায় অসমিয়া ভাষা ব্যবহার সম্ভব হয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং বিরিঞ্চিকুমার বরুয়ার জন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অসমকে ব্রাত্য নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় অংশ হিসাবে ভাবতেন শ্যামাপ্রসাদ। তাঁর কাছে অসমের জনগণ, ভাষা ও ভূমি ছিল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, লিখেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা।
এক্স পোস্টে হিমন্ত লিখেছেন, অসমের প্রত্যেকের, বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্ম, জানা উচিত যে আজ যে তারা নিজেকে ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দেয়, নিজের ভাষায় পড়াশোনা করে, তাদের রীতি মানতে পারে এটা সম্ভব হয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও গোপীনাথ বরদলৈয়ের জন্য।