অসমে নিষিদ্ধ হচ্ছে লিভ-ইন-রিলেশনশিপ! শীঘ্রই লাগু হবে UCC

118

স্টাফ রিপোর্টার, গুয়াহাটি: অসমে শীঘ্রই লাগু হবে Uniform Civil Code বা UCC. নতুন আইনি ব্যবস্থায় রাজ্যে নিষিদ্ধ হবে ‘লিভ-ইন-রিলেশনশিপ’। বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এমনই আভাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।

লিভ-ইন-রিলেশনশিপ

‘লিভ-ইন-রিলেশনশিপ’ কী?

‘লিভ-ইন-রিলেশনশিপ’ আসলে কী? আসলে এটি এমন একটি সম্পর্ক, ভারতের মতো দেশে যার কোনও সামাজিক মর্যাদা বা গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। বিপরীত লিঙ্গের দুই প্রাপ্তবয়স্ক একসঙ্গে থাকার নামই ‘লিভ-ইন-রিলেশনশিপ’। বিষয়টি পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এমনকি আদালতেও গড়িয়েছে বিষয়টি। বিয়ে না করে তরুণ-তরুণীদের একসঙ্গে থাকা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সে নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে দেশে। বিপরীতে এই সম্পর্কের পক্ষেও সওয়াল করছেন একাংশ। কিন্তু যে সম্পর্কে কোনও নাম হয় না, যে সম্পর্কে থাকে ঝুঁকি, সেই সম্পর্কেই জড়াচ্ছে আজকের যুব প্রজন্ম। শুধু কসমোপলিটান শহর নয়, আজকাল দেশের ছোট ছোট শহরেও বাড়ছে ‘লিভ-ইন-রিলেশনশিপ’-এর প্রবণতা।

অসমে কি বন্ধ হবে ‘লিভ-ইন-রিলেশনশিপ’?

বুধবার গুয়াহাটির কইনাধরায় অনুষ্ঠিত হল অসম মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের চার নবনিযুক্ত মন্ত্রী অজন্তা নেওগ, অতুল বরা, চরণ বড়ো ও রামেশ্বর তেলি। মন্ত্রিসভার বৈঠকে Uniform Civil Code বা UCC লাগু নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ইঙ্গিত দেন যে অসমে বহুবিবাহ, লিভ-ইন-রিলেশনশিপ ইত্যাদি বন্ধ নিষিদ্ধ হবে ইউসিসি লাগুর মাধ্যমে।

কবে অসমে লাগু হবে Uniform Civil Code?

সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানান, আগামী ২৩ মে থেকে শুরু হবে অসম বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন। তিনদিন ধরে চলবে সদনের কাজ। মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণ, বিধায়কদের শপথ গ্রহণ ছাড়াও বেশ কিছু কর্মসূচি রয়েছে। বিধানসভা অধিবেশনের শেষ দিন অর্থাৎ আগামী ২৬ মে অসম বিধানসভায় পেশ হবে Uniform Civil Code বা UCC লাগু নিয়ে একটি বিল। ওই বিল সদনে পাশ হলেই শীঘ্রই লাগু হবে সারা রাজ্যে।

অসমে Uniform Civil Code নিয়ে বিতর্ক

Uniform Civil Code বা ইউসিসি নিয়ে অসমেও রয়েছে বহু বিতর্ক। বিশেষ করে এই আইন নিয়ে ভীতিগ্রস্ত অসমের সংখ্যালঘু সমাজ। এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ‘আমরা রাজ্যে UCC লাগু করব। কিন্তু মানুষের ধর্মীয় আচার ব্যবস্থায় এর কোনও প্রভাব পড়বে না। প্রতিটি ধর্মের মানুষ আগে যে ভাবে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে আসছিলেন, ভবিষ্যতেও সেইভাবে তারা তা পালন করবেন। শুধুমাত্র বিয়ের বয়স, বিবাহ বিচ্ছেদ, বিয়ের রেজিস্ট্রেশন, মেয়েদেরও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করা ইত্যাদি বিষয় Uniform Civil Code-এর অধীনে আসবে। বন্ধ হবে বহুবিবাহ, লিভ-ইন-রিলেশনশিপ।’

Uniform Civil Code নিয়ে রাজনীতি

প্রথম কার্যকালের শেষ অধিবেশনে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছিলেন, তৃতীয়বার যদি অসমের ক্ষমতায় বিজেপি ফিরে আসে, তাহলে বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই সদনে পেশ হবে Uniform Civil Code নিয়ে বিশেষ বিল। যেমন কথা, তেমন কাজ। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে অসমের ক্ষমতায় ফিরে এসেছে বিজেপি। তাও আবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। একা বিজেপি পেয়েছে ৮২টি আসন। তাই পূর্বের চেয়ে বেশি আগ্রাসী দেখা যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে। ফলে আগামীদিনে Uniform Civil Code নিয়ে উত্তপ্ত হতে পারে অসম বিধানসভা।

UCC-এর আওতায় আসছেন না উপজাতিরা!

হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়ে দিয়েছেন, UCC-র আওতায় আসবে না রাজ্যের উপজাতি সমাজ। তারা আগের মতোই থাকবে তাঁদের আইনি ব্যবস্থা। উল্লেখ্য, গুয়াহাটির মতো শহরেও বেড়েছে ‘লিভ-ইন-রিলেশনশিপ’-এর প্রবণতা। বিশেষ উপজাতি সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশ লিভ-ইন-রিলেশনশিপে অভ্যস্ত। অসমে Uniform Civil Code বা UCC লাগু হলেও তাঁদের উপর কোনও প্রভাব পড়বে না বলে ধারণা করছেন আইনজীবীরা।

আইন কী বলছে?

কোনও বিবাহিত পুরুষ যদি কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার সঙ্গে পারস্পরিক সম্মতিতে একত্রবাস (লিভ-ইন) করেন, তবে তা অপরাধ নয়! একটি মামলায় এমনই পর্যবেক্ষণ এলাহাবাদ হাই কোর্টের। আদালত নির্দেশে জানিয়েছে, একত্রবাসকারী ওই যুগলের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। সেই সঙ্গে পুলিশকে তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরের এক লিভ-ইন যুগল আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। লিভ-ইন-রিলেশনশিপে থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। কারণ পুরুষ সঙ্গীটি বিবাহিত। আদালত তার পর্যবেক্ষণে ‘নৈতিকতা’ এবং আইনকে আলাদা রাখার উপর জোর দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, আইন অনুযায়ী ওই ব্যক্তি কোনও অপরাধ করেননি বলেই মনে হচ্ছে। আদালত আরও বলেছে, নাগরিকদের অধিকার রক্ষার জন্য গৃহীত পদক্ষেপ কখনই সামাজিক মতামত বা নৈতিকতা দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না। আদালত পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে, আবেদনকারীদের গ্রেফতার করা যাবে না। শুধু তা-ই নয়, পরিবারকে সতর্ক থাকতে হবে। তারা যেন কোনও ভাবে ওই যুগলের ক্ষতি করতে না-পারে তা নিশ্চিত করতে হবে পুলিশকে। এ ছাড়াও, দুই পরিবারের কেউ ওই যুগলের বাড়িতে প্রবেশ বা যোগাযোগ করতে পারবেন না, আদালত নির্দেশে জানিয়েছে। আদালতের মতে, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনের। আদালতে আবেদন করেছিলেন অনামিকা এবং নেত্রপাল। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ৮ জানুয়ারি অনামিকার মা কান্তি শাহাজানপুরের জৈতিপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘প্রলোভন’ দেখিয়েছেন নেত্রপাল। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ৮৭ ধারায় মামলাটি রুজু হয়। সেই মামলাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হন লিভ-ইন যুগল। হাই কোর্টে জানানো হয়, তাঁরা দু’জনেই প্রাপ্তবয়স্ক। বর্তমানে পারস্পরিক সম্মতিতে একত্রবাস করছেন। যদিও অনামিকার মায়ের অভিযোগ ছিল, নেত্রপাল বিবাহিত। সে ক্ষেত্রে অন্য মহিলার সঙ্গে সহবাস করা ফৌজদারি অপরাধ। তবে শুনানিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ, নেত্রপাল সত্যিই যদি পারস্পরিক সম্মতিতে কোনও প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে একত্রবাস করেন, তবে তা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে না।

তবে অসমে UCC লাগু হলে আইনি ব্যবস্থায় কতটুকু পরিবর্তন আসে তা হবে লক্ষ্যণীয়।