মেয়র পদে ইস্তফা দিলেন ফিরহাদ হাকিম

43

নিউজ ডেস্ক: গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। শুক্রবার দুপুরে মেয়র পদে ইস্তফা দিলেন ফিরহাদ হাকিম। ২০১৮ সাল থেকে কলকাতা পুরসভায় ফিরহাদ জামানার অবসান হল। সাংবাদিক বৈঠকে পদত্যাগের ঘোষণা করে ফিরহাদের মন্তব্য, ‘এই চেয়ারের একটা আলাদা সম্মান আছে। কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। চেয়ার ধরে বসে থাকা অসম্মানের। এই চেয়ারের সম্মান নষ্ট করতে পারি না। আমি আর মেয়র থাকছি না। ফিরহাদ হাকিম কেউ নয়।’

২০১৮ সালে কলকাতা পুরসভার মেয়র পদে ইস্তফা দেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের প্রথম পছন্দ ছিলেন ফিরহাদ হাকিম। ২০০০, ২০০৫ এবং ২০১০ সালে কলকাতা পুরসভার ৮২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে জিতলেও ২০১৫ সালে পুর নির্বাচনে লড়াই করেননি ফিরহাদ হাকিম। সেবার এই ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হন প্রণব বিশ্বাস। ২০১৮ সালে পুরসভার উপনির্বাচনে এই ওয়ার্ড থেকেই জিতে আসতে হয় ফিরহাদ হাকিমকে। এরপর থেকে তৃণমূল জামানায় মন্ত্রীর দায়িত্বের পাশাপাশি সামলেছেন কলকাতা পুরসভার মেয়রের দায়িত্ব। ফিরহাদের ইস্তফার সঙ্গে সঙ্গে পুরসভায় তৃণমূল জামানার কার্যত অবসান হয়ে গেল।

সাংবাদিক বৈঠকে নিজের মেয়াদকালে কলকাতার উন্নয়নের খতিয়ানও তুলে ধরেন তিনি। শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাস্তা সংস্কার, নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, পানীয় জলের পরিষেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন, পুরসভার ডিজিটাল পরিষেবা চালু করা, পার্ক ও খেলার মাঠ সংস্কার, বস্তি এলাকায় নাগরিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং করোনা পরিস্থিতিতে জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মত একাধিক প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কলকাতাকে আরও আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করেছে।

সাংবাদিক বৈঠকে আক্ষেপের সুর ফিরহাদ হাকিমের গলায়। তাঁর দাবি, ‘জল নিকাশি কাজ করেছি। জল জমা সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছি। বেশ কিছু পাম্পিং স্টেশনের কাজ হয়নি। ঠনঠনিয়াতে আজও জল জমে। আশা করব সেই জল আর জমবে না। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। নেতাজিকে সম্মান জানানোর ইচ্ছে ছিল। সেই কাজটা করে যেতে পারলাম না। অনেক কাজ শেষ করতে পারলাম না। আগামিদিনে যা দায়িত্ব নেবে, তাঁরা কাজ করব।’

বিদায়ের মুহূর্তে কলকাতা পুরভবনের মেয়র কক্ষে শেষবারের মতো প্রবেশ করেন।সিঁড়ি তে রাখা ঐতিহাসিক চেয়ার-টেবিলকে প্রণাম করেন, যা একসময় ব্যবহার করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এরপর পুরভবনের ৫ নম্বর এস.এন. ব্যানার্জি রোডের ঐতিহ্যবাহী ছোটো‘লালবাড়ি’ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন ফিরহাদ হাকিম। পুরসভার কর্মী, কাউন্সিলর এবং অনুগামীদের একাংশ তাঁকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন। অনেকের চোখেই ধরা পড়ে আবেগের ছাপ।কয়েকদিন যাবত মেয়রের নির্দিষ্ট গাড়ি ছেড়ে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতেই যাতায়াত করছিলেন তিনি এদিনও নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতেই পুরো ভবন ছাড়েন তিনি।

ফিরহাদ হাকিমের ইস্তফা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই জল্পনা চরমে পৌঁছেছিল। বিশেষ করে কুণলা ঘোষ দাবি করেন,‘ফিরহাদ হাকিম আগে একাধিক বার নেত্রীকে মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। নেত্রী তাতে সম্মতি দিয়েছেন।’ কিন্তু ফিরহাদ সেই দাবি অস্বীকার করে জানান, ‘পদত্যাগের বিষয়ে আমি কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি।’ এরপরই শুক্রবার কলকাতা পুরসভায় মেয়রের পদে ইস্তফা দিয়ে দিলেন ফিরহাদ হাকিম।

ফিরহাদের পদত্যাগে কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। কে হবেন কলকাতার পরবর্তী মেয়র, সেই প্রশ্ন এখনই সামনে চলে এসেছে। তবে বিদায়বেলায় ফিরহাদের বক্তব্য, ‘কলকাতার মানুষের ভালোবাসা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি যে দায়িত্ব পালন করেছি, তা সর্বশক্তি দিয়ে করার চেষ্টা করেছি। কোথাও ব্যর্থ হয়ে থাকলে তার দায় আমারই।’মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁর এই পদত্যাগ কলকাতার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা । তবে এই কয়েক মাসের জন্য কলকাতা পুরসভায় প্রশাসনিক পর্যবেক্ষক বসানোর সম্ভাবনায় বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।