গোলকধাঁধার মত হোটেল, তাজ্জব হোটেলের প্ল্যানিং, আগুনে আহতদের দেখতে হাসপাতালে বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার

42

পৃথা দাশগুপ্ত,কলকাতা: ঘড়ির কাঁটায় রাত রাত পৌনে ২ টো। নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঘুপচি হোটেল। তাজ্জব তাঁদের ইন্টেরিয়র। ঘরের ভেতর ঘর। পাশে ছোট সিঁড়ি। এন্ট্রি এবং এক্সিট গেটও ছোট। মেরেকেটে পাঁচ ফুট। কলাপসিবল গেটের জন্য দু’পাশটা আরও খানিকটা চাপা। সেটাই মূল প্রবেশ পথ বিল্ডিংয়ের। লোহার কলাপসিবল গেটের চর্তুদিকে ঝুলছে বোর্ড। তাতে এক-একটা হোটেলের নাম লেখা। মোট ৬ টা হোটেল এক‌ই জায়গায়।

অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন বহু আবাসিক। অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক। কেউ চিকিৎসার জন্য আবার কেউবা অন্য কাজে শহরে এসেছেন। আচমকা ধোঁয়া। দমবন্ধ পরিস্থিতি । চীৎকার শুরু হতেই ঘুম ভাঙে সকলের। তারপর আগুনের সঙ্গে অসম লড়াই।‌ কেউ কেউ বেরোতে পারলেন, কেউ কেউ পারলেন না।

কিন্তু এই হোটেলট্রেড লাইসেন্স পেল কীভাবে? প্রশ্ন উঠছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছান দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী।

তারাপীঠের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনার রেশ কাটিয়ে ওঠার আগেই বুধবার মাঝরাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে। মৃত্যু হয় ৯ জনের। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, এসির শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগেছে।

ঘটনাস্থলে দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী প্রশ্ন তুলছেন, “এই ধরনের হোটেলগুলো ট্রেড লাইসেন্স কীভাবে পেল? মির্জা গালিব স্ট্রিটে আমাদের একটা অফিস রয়েছে। তার পাশেই ওই বিল্ডিংটা। ওখানে প্রত্যেকটা ফ্লোরেই ছোট ছোট হোটেল রয়েছে। সেখানে পাশাপাশি দুটো লোক নড়তে পারবেন না। কোনও এক্সটার্নাল সিঁড়ি নেই, যেখান থেকে বিপদে মানুষকে উদ্ধার করা যাবে। দেখলে অবাক হয়ে যাবেন। এই ধরনের হোটেলের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে।”

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগে এসে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মহম্মদ খালেদ। তিনি জানান, “ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক জন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। বাকি আট জন বাংলাদেশি বলে প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত পুলিশ মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি। মৃতদেহ মর্গে রাখা হয়েছে। পুলিশ পরিচয় নিশ্চিত করলেই বাংলাদেশি নাগরিকদের দেহ নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে”।

কোনও মতে প্রাণ হাতে নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলেও সেই মুহূর্তের কথা ভেবেই শিউরে উঠছেন মহম্মদ আমিরুলরা। তাঁরা বলছেন, “আরেকটু হলে মরেই যেতাম। ফায়ার এলার্ম বাজেনি। হোটেলের লিফট বন্ধ ছিল। তবে দমকল যথাসময় এসেছে। “

এক অতিথি বলেন, “আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ দরজায় জোরে ধাক্কা। বলল হোটেল বয়। খুলব কি না, সেটা ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম। দরজা খুলতেই হোটেল বয় বললেন, দাদা হোটেলে আগুন লেগেছে। আমরা দোতলায় ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে আসি।”

বাংলাদেশ থেকে আসা এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা নিচের রুমে ছিলাম। যখন আগুনটা লাগে, লোকজন হইচই করছে শুনে আমরা বেরিয়ে আসি। দেখি, ধোঁয়ায় চারিদিক ভরে গিয়েছে। দমকল এসে মই দিয়ে লোক নামায়। যারা চারতলা, পাঁচতলায় ছিলেন, তাঁরা ভয় পেয়ে ছাদে উঠে যান।”

উল্লেখ্য, যে বিল্ডিংয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেখানে একাধিক ছোট ছোট হোটেল রয়েছে। অধিকাংশেরই ঘরের মাপ ৮ ফুট বাই ৮ ফুট। অগ্নিকাণ্ডের পর ওই ব্লিডিং থেকে মোট ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে খবর। একদিকে যেমন বিল্ডিং এর প্ল্যান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, পাশাপাশি অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ঘটনার তদন্ত করছে নিউমার্কেট থানার পুলিশ। ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেছে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করছেন তাঁরা।