ফের মোদী-জিনপিং বৈঠক

32

নিউজ ডেস্ক: ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে শনিবার ভারতে আসছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দিল্লিতে সেদিনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিতে পারেন চিনের প্রেসিডেন্ট। ২০২০ সালে গালওয়ানে দুদেশের বাহিনীর সংঘর্ষের পর এই প্রথম মোদী-জিনপিং বৈঠক হতে চলেছে।
এই বৈঠকের দিকে নজর গোটা বিশ্বের। কেননা দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক দূরত্ব এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর ভারত ও চিনের সম্পর্কের বরফ গলানোর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে শনিবার শি জিনপিং আসবেন ভারতে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সম্মেলন। ২০২০ সালে গলওয়ান সংঘর্ষের পর এই প্রথম ভারতে আসছেন জিনপিং।
সম্প্রতি কিরগিজস্তানের বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন শীর্ষ সম্মেলনে দুই নেতা একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এবং করমর্দনও করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়নি।

জিনপিংয়ের সফরের আগে কূটনৈতিক তৎপরতা
চিনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের প্রাক্কালে, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল সম্প্রতি চিনে গিয়েছিলেন। ভারত-চিন সীমান্ত বিষয়ক ‘ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়ে দুই দেশের আলোচনাও হয়েছে।
লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে উত্তেজনাপূর্ণ কয়েকটি এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটেই ফের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।

গালওয়ান থেকে স্থিতিশীলতার পথে
২০২০ সালের জুন মাসে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের পর থেকে ভারত-চিন সম্পর্ক তীব্র টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ওই সংঘর্ষে ভারতের ২০ জন সৈন্য নিহত হন এবং পরে চিন তাদের ৪ জন সৈন্যের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে।
এই সংঘাতের ফলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে।
এরপর থেকে সীমান্ত সংলগ্ন উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার এবং উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে উভয় পক্ষ একাধিকবার সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা করেছে। সৈন্য প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ার ফলে সামরিক সংঘাতের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমে এলেও, বৃহত্তর সীমান্ত বিরোধটি এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ সীমিত থাকার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করবে।

আলোচনায় কাঁটা অরুণাচল প্রদেশ
পূর্ব লাদাখে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও, এই মুহূর্তে ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সীমান্ত বিরোধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর এক্ষেত্রে অরুণাচল প্রদেশ অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চিন গোটা অরুণাচল প্রদেশের ওপর নিজের দাবি জানিয়ে আসছেষ অরুণাচল প্রদেশকে চিন জাংনান বা দক্ষিণ তিব্বত হিসেবে অভিহিত করে। ভারত ধারাবাহিকভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে এবং দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ।
সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি অঞ্চলে চিনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং তাদের আগ্রাসী মনোভাবের খবর সামনে আসার পর এই এলাকা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এই ঘটনাপ্রবাহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভারত বারবারই বলে আসছে যে, বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা অপরিহার্য।
এ ছাড়া ২০১৭ সাল থেকে চিন অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানের জন্য নিজস্ব নাম সম্বলিত তালিকা প্রকাশ করছে। ভারত বরাবরই এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের বক্তব্য, ভারতীয় ভূখণ্ডের কোনও স্থানের জন্য বিকল্প নাম নির্ধারণ করলেই সেগুলোর আইনি বা আঞ্চলিক মর্যাদার পরিবর্তন ঘটে না।
অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রচলিত ভারতীয় নামে চিহ্নিত করার যে সিদ্ধান্ত ভারত নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে বেজিংয়ের সমালোচনাও নয়াদিল্লি প্রত্যাখ্যান করেছে।

কী বিষয়ে আলোচনা হতে পারে?
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং শি জিনপিংয়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সীমান্ত সমস্যা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধের কৌশল নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এই আলোচনা এমন এক জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন ভারত ও চিন উভয় দেশই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-সংক্রান্ত পদক্ষেপ এবং পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার কারণে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
নয়াদিল্লির জন্য বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়টি সম্ভবত দুটি সমান্তরাল লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে, যা হল সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একইসঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা, যা ভারতের বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।