উচ্ছেদের পর আদানিকে জমি অসমে

15

নিউজ ডেস্ক: অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ধুবড়িতে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিতপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। যেখানে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ১৪০০ বাংলাভাষী মুসলমান পরিবারের বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি চাপর রাজস্ব চক্রের অধীন চরুয়াবাখরা, চিরাকুটা ১ ও ২ এবং সন্তোষপুর গ্রামে অবস্থিত।
বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জায়গা তৈরির লক্ষ্যে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে অসম সরকার এই গ্রামগুলোর প্রায় ১,১৫৭ একর সরকারি জমিতে বসবাসরত ১,৪০০-রও বেশি বাংলাভাষী মুসলমান পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। জমিটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘আসাম পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড’-কে বরাদ্দ করা হয়েছিল, যারা পরবর্তীতে প্রকল্পটির জন্য তা ‘আদানি পাওয়ার লিমিটেড’-কে হস্তান্তর করে।
এই উচ্ছেদ অভিযানের ফলে প্রায় ১০,০০০ বাংলাভাষী মুসলমান, যারা অন্তত তিন থেকে চার দশক ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছিলেন, ঘরহারা হয়ে পড়েন।
সেসময় স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেছিলেন যে, এঁদের মধ্যে অনেকেই হলেন নদীভাঙনের শিকার, যাঁরা ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়েছেন।
রবিবার অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ৩,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প অসমের বৃহত্তম বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং এটি রাজ্যের বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
আদানি গ্রুপ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলাকালীন ২০,০০০ পর্যন্ত এবং এটি চালু হওয়ার পর প্রায় ৫,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।


হিমন্ত এর আগে জানিয়েছিলেন যে, আদানি গ্রুপ গত ফেব্রুয়ারি মাসে অসমে আয়োজিত একটি ব্যবসায়িক সম্মেলনে ৫০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এটি তারই একটি অংশ।
গত ১৪ জুলাই, কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের অধীনস্থ বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি আদানি পাওয়ার লিমিটেডের প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার সুপারিশ করে।
পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য জমা দেওয়া আবেদনে আদানি গ্রুপ মন্ত্রককে জানিয়েছিল যে, প্রকল্প এলাকায় কোনও বসতি নেই এবং তাই সেখানে পুনর্বাসন বা স্থানান্তরের কোনো বিষয় জড়িত নয়। তবে উচ্ছেদের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন যে, অসম সরকার জোর করে উচ্ছেদের মাধ্যমে এলাকাটি খালি করেছে, যার ফলে ১,৪০০ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে এবং তাদের কোনও পুনর্বাসন বা স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়নি।
ওই বাসিন্দা বলেন, জোর করে দখল করা ৩,৫০০ বিঘা সরকারি জমির পাশাপাশি আরও ১,৭০০ বিঘা জমি, যার মালিকানা বা বৈধ দলিল স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে ছিল, সেগুলোও অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমির মালিকানা বা দলিল থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি, যদিও তাঁদের প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে।
জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য বাইজার আলগা গ্রামে ৩০০ বিঘা জমি বরাদ্দ করেছে এবং তাঁদের জিনিসপত্র স্থানান্তরের সহায়তার জন্য এককালীন ৫০,০০০ টাকা ত্রাণের ব্যবস্থা করেছে।
তবে কিছু বাসিন্দা জানিয়েছেন যে, তাঁরা ওই নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হতে অনিচ্ছুক, কারণ জায়গাটি ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝখানে অবস্থিত একটি নিচু ও নদীবেষ্টিত এলাকা।
২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জেলা-স্তরের ভূমি বিষয়ক পরামর্শক সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য গ্রামের ‘চারণভূমি’-কে অন্য কাজে ব্যবহারের একটি প্রস্তাব জেলা প্রশাসন ৩০ মার্চ, ২০২৫ তারিখে জমা দিয়েছিল।
এরপর জেলা প্রশাসন উচ্ছেদের নোটিশ জারি করে এবং বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়।
২০১৬ সালে অসমে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন জেলায় একাধিক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল বাংলাভাষী মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায়। ২০১৬ সাল থেকে পরিচালিত এসব উচ্ছেদ অভিযানের সময় অন্তত আটজন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।