নিউজ ডেস্ক: ২০২৬ FIFA বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নজিরবিহীন কূটনৈতিক সংঘাত, ভিসা জটিলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখে পড়েছে, যা বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। আমেরিকা, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টটি মাঠের খেলার চেয়ে মাঠের বাইরের চরম বিশৃঙ্খলা ও বিতর্কের কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে “বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ” হিসেবে বলা হচ্ছে।
১. রেফারি নির্বাসন ও নজিরবিহীন এয়ারপোর্ট ড্রামা
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে রেফারি প্যানেলে। আফ্রিকার বর্ষসেরা রেফারি ও সোমালিয়ার ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত ওমর আব্দুল কাদির আরতান-কে মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর প্রায় ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে মার্কিন ইমিগ্রেশন। বৈধ ভিসা এবং কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) “নিরাপত্তা যাচাইকরণ বা ভেটিং সংক্রান্ত জটিলতা” ও “সন্ত্রাসবাদী সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ” দেখিয়ে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না দিয়ে ইস্তাম্বুলগামী ফিরতি ফ্লাইটে তুলে দেয়। ফিফার নিজস্ব টুর্নামেন্টে তাদেরই অফিশিয়াল রেফারিকে আয়োজক দেশ কর্তৃক তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে অলিখিত ও নজিরবিহীন।
২. ইরান দলের সীমান্ত জটিলতা ও মেক্সিকোতে আশ্রয়
ভূ-রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে ইরান ফুটবল দল সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন সরকার ইরান দলকে দীর্ঘমেয়াদে সেদেশে থাকার অনুমতি দেয়নি। ফলে FIFA-র হস্তক্ষেপে মেক্সিকো সরকার এগিয়ে আসে এবং ইরান দল মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিহুয়ানায় (Tijuana) তাদের মূল প্রস্তুতি শিবির স্থাপন করতে বাধ্য হয়। কঠোর নিয়মানুযায়ী, ইরান দল কেবল তাদের ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে এবং খেলা শেষ হওয়া মাত্রই আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হবে। তদুপরি, ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজসহ দলের অন্তত ১৫ জন শীর্ষ কর্মকর্তা ও সাপোর্ট স্টাফকে সম্পূর্ণভাবে ভিসা দেয়নি ওয়াশিংটন। এর প্রতিবাদে ইরান টুর্নামেন্ট বর্জনের বা ম্যাচ চলাকালীন খেলা থামিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে।
৩. সাংবাদিক, ফুটবলপ্রেমী ও অন্যান্য দলের ভোগান্তি
শুধু ইরান বা সোমালিয়া নয়, ফুটবলপ্রেমী এবং সংবাদকর্মীদের ক্ষেত্রেও আমেরিকার ভিসা নীতি চরম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে- সাংবাদিকদের ক্ষোভ: আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যে বহু আফ্রিকান ও ইরানি সাংবাদিককে অ্যাক্রেডিটেশন থাকা সত্ত্বেও ভিসা দেওয়া হয়নি। আবার অনেককে দেওয়া হয়েছে ‘সিঙ্গেল এন্ট্রি’ ভিসা। এর ফলে তারা যদি মেক্সিকো বা কানাডায় ম্যাচ কভার করতে যান, তবে পুনরায় আমেরিকায় ঢুকতে পারবেন না।
সমর্থকদের স্বপ্নভঙ্গ: কাতার বা রাশিয়া বিশ্বকাপে ভ্রমণ করা প্রায় ৯০ জনেরও বেশি মরক্কো সমর্থক এবং জর্ডানের ফ্যান অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানসহ হাজারো ফুটবলপ্রেমীর ভিসা বাতিল করা হয়েছে। ইরানের জন্য বরাদ্দকৃত টিকিটের কোটাও শেষ মুহূর্তে বাতিল করার অভিযোগ উঠেছে।
খেলোয়াড়দের হয়রানি: ইরাকের তারকা স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেনকে শিকাগো বিমানবন্দরে প্রায় ৭ ঘণ্টা আটকে রেখে জেরা করা হয় এবং দলের অফিশিয়াল ফটোগ্রাফারকে ফেরত পাঠানো হয়। সেনেগাল ও উজবেকিস্তানের দলগুলোকেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের নামে হেনস্থা হতে হয়েছে।
৪. ফিফা কি বিশ্বকাপের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে?
এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে— FIFA কি সত্যিই আয়োজক দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে? সাধারণত যেকোনও বড় টুর্নামেন্ট (যেমন অলিম্পিক বা বিশ্বকাপ) আয়োজনের অন্যতম প্রধান শর্ত থাকে যে, আয়োজক দেশকে সমস্ত অংশগ্রহণকারী দেশের খেলোয়াড়, রেফারি এবং অফিশিয়ালদের নির্বিঘ্ন প্রবেশের গ্যারান্টি দিতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ফিফার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ইমিগ্রেশন এজেন্ডা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
FIFA সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো এই বিশৃঙ্খলা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে কার্যত নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। তিনি মেক্সিকো সিটির এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেছেন, “ইমিগ্রেশন নীতি আয়োজক দেশের সরকারের অধীন, এখানে ফিফার কিছু করার নেই। সবাইকে কিছুটা শান্ত হতে (Relax) হবে এবং আমাদের ওপর ভরসা রাখতে হবে।” ফিফার এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, টুর্নামেন্টের মাঠের বাইরের নিয়ন্ত্রণ এখন আর সুইজারল্যান্ডের জুরিখের FIFA সদর দফতরের হাতে নেই, বরং তা ওয়াশিংটনের বর্ডার পলিসির ইশারায় চলছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলকে বিশ্বায়নের ও অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, যেখানে দল সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮টি করা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিম সীমান্ত রাজনীতি যেভাবে খেলাটির মূল আত্মাকে অবদমিত করেছে, তা ক্রীড়া কূটনীতির এক চরম পরাজয়। ফুটবল যেখানে বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধার কথা বলে, সেখানে ২০২৬ বিশ্বকাপের কিক-অফের আগেই তৈরি হওয়া এই বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা ফুটবলের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।