দেবারতি ঘোষ, কলকাতা: ২২দিন হল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার হয়েছে। ২৬ মে, মঙ্গলবার এক বিশেষ ছবি দেখল রাজ্যবাসী। যা গত ১৫ বছরে দেখাই যায়নি। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী দলের বিধায়ক ও সাংসদরা। তৃণমূলের আমলে বারবার অভিযোগ উঠেছিল, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক প্রশাসনিক বৈঠক করলেও কোনও বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাতেন না। এবার সেই চিত্রটাই বদলে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও হুগলি- এই তিন জেলা নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠক হয় মঙ্গলবার। নদিয়ার কল্যাণীতে মঙ্গলবার প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত হন বারাসাতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। ছিলেন স্বরূপনগর বিধানসভার তৃণমূল বিধায়ক বিনা মণ্ডল, দেগঙ্গার প্রথমবারের তৃণমূল বিধায়ক আনিসুর রহমান বিদেশ এবং হাড়োয়ার বিধায়ক মহম্মদ আব্দুল মতিন। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেলেন কাকোলি ঘোষ দস্তিদার। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পরাজয়ের পর ১৫ মে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতক পদ থেকে সরানো হয় বারাসতের সাংসদ কাকলিকে। বদলে সেই পদে আসেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরই বারাসাত সাংগঠনিক জেলার সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন কাকলি। এবার বিদ্রোহী সেই নেত্রীই শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত হলেন। এবং বৈঠক নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
এদিনের বৈঠকে বিশেষভাবে নজর কাড়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদার-এর উপস্থিতি। তৃণমূল কংগ্রেস-এর এই সাংসদকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও জল্পনা তৈরি হয়েছে। কাকলি ঘোষ দস্তিদার ছাড়া উত্তর ২৪ পরগনার 6 জন বিধায়ক এদিনের বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদার নাকি বলেন, “এরকম ভালো মিটিং আগে দেখিনি” এবং অতীতে এই ধরনের প্রশাসনিক বৈঠকে তাঁদের কথা বলার সুযোগ খুব একটা দেওয়া হতো না। পাশাপাশি, উপস্থিত আধিকারিকদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, আগের সময়ে বৈঠক ঘিরে নানা ধরনের খরচ ও আনুষঙ্গিক আয়োজন বেশি ছিল, যা ভবিষ্যতে কমানো হবে।
কল্যাণী-তে আয়োজিত প্রশাসনিক বৈঠক থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও বার্তা সামনে আনলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে প্রশাসনিক কাজের গতি বৃদ্ধি, সরকারি খরচে নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন সামাজিক প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণা হিসেবে সামনে এসেছে রাজ্যের অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য নতুন ফর্ম তৈরির বিষয়টি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির জন্য নতুন আবেদনপত্র বা ফর্ম তৈরি করা হবে এবং সেই ফর্ম পূরণ করেই আবেদন করতে হবে। আগামী বুধবার নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠকের মাধ্যমে ওই ফর্ম প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, যাঁরা এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী বা প্রাপক হতে চান, তাঁদের অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে।
প্রশাসনিক বৈঠকে সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক ব্যয় কমানো এবং বিভিন্ন স্তরের সমন্বয় নিয়েও আলোচনা হয়। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগের সুরে বলেন, অতীতে বৈঠকের নামে বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুষ্ঠানে অযথা ব্যয়ের প্রবণতা ছিল। তাঁর বক্তব্য, ভবিষ্যতে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় খরচে লাগাম টানা হবে এবং সরকারি অর্থ আরও সংযতভাবে ব্যবহার করা হবে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলার একাধিক উন্নয়নমূলক বিষয়, পরিষেবা প্রদান, প্রশাসনিক নজরদারি ও জনমুখী প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে দিনের শেষে অন্নপূর্ণা যোজনার নতুন ফর্ম এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদারের উপস্থিতিই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।