নিউজ ডেস্ক: প্রবল চাপে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকুমার। তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভের মূল কারণ হল দুজন নির্বাচন কমিশনারের ভিন্নমত বা দ্বিমত পোষণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো। কিন্তু তাঁদের ভিন্নমত যদি বারবার উপেক্ষা করা হয়েই থাকে, তবে কেন তাঁরা যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া অব্যাহত রেখেছিলেন? কেন তাঁরা রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ না হয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে গিয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত নিজেদের পদে বহালই বা থাকলেন কেন?
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, দুজন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী নির্বাচনী তালিকা, ‘ফর্ম ৬’, ভোটার তথ্যের লভ্যতা এবং কমিশনের আইটি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বেশকিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। যা সামগ্রিকভাবে, জ্ঞানেশ কুমারের এসআইআর প্রক্রিয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দুই কমিশনার ১০ মাসের মধ্যে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন, যার মধ্যে একদিনেই চারবার আপত্তি জানানোর ঘটনাও ছিল। আপত্তির মধ্যে অন্যতম ছিল নির্বাচনী তালিকার ডেটাবেস কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ফলে নির্বাচনী নিবন্ধন কর্মকর্তাদের (ইআরও) বিধিবদ্ধ ক্ষমতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা।
এগুলো কোনও সাধারণ প্রশাসনিক মতপার্থক্য নয়। এসবের সম্পর্ক সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করে এবং ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। কমিশনকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, বৈধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকে উপেক্ষা করা কিংবা বিধিবদ্ধ ক্ষমতার গুরুত্ব কমিয়ে ফেলার মতো ঘটনা যদি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ঘটিয়ে থাকেন, তবে সেসবের জবাব অবশ্যই প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি অন্য নির্বাচন কমিশনারদের চেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী।
দুই নির্বাচন কমিশনারের ভিন্নমতের বিষয়টি সামনে আসার পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যকলাপ নিয়ে যে পর্যালোচনা বা প্রশ্ন উঠছে, তা যৌক্তিক। তবে একই সঙ্গে এটাও খতিয়ে দেখা জরুরি যে, নিজেদের আপত্তি বা দ্বিমত তুলে ধরার ক্ষেত্রে ওই দুই নির্বাচন কমিশনার তাঁদের সাধ্যমতো সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি না।
কমিশনের কর্মপদ্ধতি যদি এতই ত্রুটিপূর্ণ বলে তাঁদের মনে হয়ে থাকে যে তাঁদের আপত্তিগুলো বারবার উপেক্ষা করা হচ্ছিল, তবে তাঁরা কেন এই প্রতিষ্ঠানের হয়ে প্রকাশ্যে সাফাই গাওয়ার কাজ চালিয়ে গেলেন? মতপার্থক্য দেখা দেওয়ার সময় তাঁরা কেন পূর্ণাঙ্গ কমিশনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের জন্য জোর দাবি জানালেন না? নির্বাচন কমিশন যেখানে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা, সেখানে তাঁরা কেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে চিঠি লিখলেন? তাঁরা কি রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখেছিলেন, যিনি তাঁদের নিয়োগ অনুমোদন করেন?
এবং নির্বাচন কমিশনাররা যদি মনে করে থাকেন যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিষ্ঠানটি আর যথাযথভাবে কাজ করছে না, তবে তাঁরা কেন পদত্যাগ করলেন না? এই প্রশ্নগুলো জ্ঞানেশ কুমারের ওপর আরোপিত কঠোর পর্যালোচনার গুরুত্বকে কোনোভাবেই খর্ব করে না; বরং তা সেই পর্যালোচনাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়।
জ্ঞানেশকুমারের প্রশ্নের জবাব দেওয়া উচিত
শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারও যেহেতু প্রশ্নের মুখে পড়েছেন, তাই বলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পেতে পারেন না।
কমিশন কীভাবে কাজ করছে তা নিয়ে সান্ধু ও জোশী বারবার আপত্তি জানিয়েছিলেন। অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয় ছিল ভোটার তালিকার ডেটাবেস ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়করণের প্রক্রিয়া। নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত বিধিবদ্ধ নথি ‘ফর্ম ৬’ নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।
জোশী ১৬ মে ২০২৬ নথিবদ্ধ করেছিলেন যে, ‘ফর্ম ৬’-এ প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কোনও এসআইআর আদেশের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়; কারণ এই ফর্মটি ‘নিবন্ধীকরণ বিধিমালা, ১৯৬০’-এর অধীনে নির্ধারিত। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, প্রয়োজনীয় বিধি পরিবর্তনের জন্য বিষয়টি সরকারের কাছে পাঠানো হোক। ১৯ মে সান্ধুও তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
অথচ পরে বিতর্কিত পরিবর্তনগুলো নির্বাচন কমিশনের অনলাইন পোর্টাল ‘ইসিআইনেট’ (ECINet)-এ দেখা যায়। ১৩ আগস্ট সান্ধু ফের উল্লেখ করেন যে, ওই পরিবর্তনগুলো ছিল অননুমোদিত বা বেআইনি এবং তিনি সেগুলো বাতিলের দাবি জানান।
এরপর কী হল? তাঁদের মতামত কি খারিজ করা হয়েছিল? এবিষয়ে কি কমিশনের কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? সংখ্যাগরিষ্ঠের মত কি কার্যকর হয়েছিল? তিনজন কমিশনারই কি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন? আর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যদি দ্বিমত পোষণ করে থাকেন, তবে তা কোন আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে করেছিলেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর জ্ঞানেশকুমার ও নির্বাচন কমিশনের দেওয়া উচিত।
বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ। সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের বিষয়ে ২০২৩ সালে প্রণীত আইনেও বহু-সদস্যবিশিষ্ট কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে; যেখানে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত সম্ভব না হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই প্রাধান্য পায়।
সুতরাং, প্রশ্ন শুধু এটা নয় যে সান্ধু ও জোশী জ্ঞানেশকুমারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন কি না। আসল প্রশ্ন হলো, তাঁদের সেই দ্বিমত বা মতপার্থক্য আইন অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়েছিল কি না। পাশাপাশি, তাঁদের হাতে থাকা আইনি ক্ষমতা তাঁরা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিলেন কি না, তাও অজানা।