নিউজ ডেস্ক: তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে বাংলাদেশে সবরকম সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চিন। স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগে ভারত। কেননা তিস্তা নদী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গেও তিস্তার সম্পর্ক রয়েছে।

যদিও তিস্তা প্রকল্পে ভারতের ‘উদ্বেগ’ প্রসঙ্গে চিনের তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে এই সহযোগিতার তৃতীয় কোনো পক্ষকে ‘লক্ষ্য করে নয়’। তৃতীয় কোনো পক্ষের ‘হস্তক্ষেপও চায় না’ চিন। সম্প্রতি একথা বলেছেন চিনের পররাষ্ট্র মন্তর্কের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন।
চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে প্রস্তুত আছে চীন। এক্ষেত্রে অর্থনীতি ও বাণিজ্য, জল সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াতে চায়।
গুও জিয়াকুন বলেছেন, জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে কী করা যায়, তার জন্য প্রস্তুত আছে চিন।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের জলসম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার জলবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুপক্ষ একমত হয়েছিল।
মনমোহন সিংয়ের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়।
নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি।
ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি আটকে থাকার মধ্যে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ হাতে নেয় বাংলাদেশ সরকার। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বেইজিং সফরে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পে চিন সরকারের সহায়তা চেয়েছিলেন।
এ প্রকল্পে চিনা সংস্থাকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকাকে নয়া দিল্লির উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই বেইজিং প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আনুষ্ঠানিক প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়।
এর মধ্যেই ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে ভারত অংশীদার আগ্রহ প্রকাশ করে। এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ আগস্ট ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে চলে আসেন তিনি। গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চিনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা (৭৫০ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৫৫০ মিলিয়ন ডলার চিনের কাছে ঋণ হিসেবে চাওয়া হয়েছে। এনিয়ে সম্প্রতি চিন সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলোচনা করেন চিনের সঙ্গে।
তিস্তা প্রকল্পে চিনের সহায়তার বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে দেখছে না ভারত। কারণ এটা সরাসরি ভারতের নিরাপত্তা-স্বার্থের পরিপন্থী। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলবে চিন। এবং নয়াদিল্লি মনে করে, সেটাই আসল উদ্দেশ্য চিনের।