নিউজ ডেস্ক: SIR করার অধিকার আছে নির্বাচন কমিশনের। এসআইআরের আইনি বৈধতা নিয়ে মামলায় রায় শীর্ষ আদালতের। মুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্যই প্রয়োজন এসআইআর, রায় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত মিশ্র, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি বেঞ্চের।
গত বছর বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসআইআর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল নির্বাচন কমিশন। এসআইআরের আইনি বৈধতা নিয়ে শীর্ষ আদালতের মামলা করেছিল অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র প্রমুখ। মামলাকারীদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছিলেন কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিংভি, শাদান ফারাসত, প্রশান্তভূষণ, বৃন্দা গ্রোভারের মতো নামী আইনজীবী। কমিশনের পক্ষে যুক্তি দর্শান মূলত আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদি, মনিন্দর সিং, একলব্য দ্বিবেদি প্রমুখ। দুপক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর এতদিন রায় সংরক্ষিত রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার সেই মামলার রায় দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
নির্বাচন কমিশনের কি এসআইআর পরিচালনা করার ক্ষমতা রয়েছে? এসআইআর-এর উদ্দেশ্য কি বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত? এসআইআর কি জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মাবলির পরিপন্থী? সংবিধান ও আইন দ্বারা প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কি নির্দিষ্ট তথ্য বা নথি চাওয়ার ক্ষমতা রাখে? মূলত এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে আদালত।
শীর্ষ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এসআইআর করার ক্ষমতা রয়েছে। এটি সাধারণ প্রক্রিয়া থেকে আলাদা হলেও একে বেআইনি বলা যায় না। এসআইআর প্রক্রিয়া কোনও আইন ভঙ্গ করেনি। এইসঙ্গে আদালতের রায়, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৪ মোতাবেক কমিশনকে যে সাংবিধানিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এসআইআর সেই দায়িত্বকেই কার্যকর করছে, এবং তা আইনি সীমার মধ্যেই করছে। কমিশন তার আইনগত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কাজ করেছে, একথা বলা যায় না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, শুধু ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়ার উপর অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নির্ভর করে না। এর মূল ভিত্তি হল সঠিক, নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য ভোটার তালিকা। ভোটার তালিকাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে। রায়ে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখার পাশাপাশি নাগরিকদের অধিকারও যেন সুরক্ষিত থাকে সেভাবেই এসআইআর করা হয়েছে।
এসআইআরের উদ্দেশ্য বৈধ এবং সংবিধানসম্মত উল্লেখ করে শীর্ষ আদালত বলেছে, ভোটার তালিকায় নাম থাকা মানেই সেই ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন তোলা যাবে না, এমন নয়। ভোটার তালিকায় নাম থাকলে নাগরিকত্বের একটি প্রাথমিক স্বীকৃতি থাকে, কিন্তু সেই নাম বৈধ কি না সেটা বিচার করতে পারে নির্বাচন কমিশন।
এসআইআরের মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া আইনের সীমার মধ্যেই রয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট নথি চাওয়া বেআইনি নয় এবং নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের নথি নির্দিষ্ট করার ক্ষমতা আছে। এসআইআর প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটারকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা বলা ঠিক নয়, রায় আদালতের। এরপরই রায়ে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা তৈরির সময় নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা শুধুই ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার প্রশ্ন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ধারণের অধিকার নেই নির্বাচন কমিশনের।
ভোটার তালিকায় নাম না থাকার সঙ্গে নাগরিকত্বের সম্পর্ক নেই, রায়ে বলেছে শীর্ষ আদালত। ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানেই কাউকে বিদেশি নাগরিক ঘোষণা করা যায় না। বাদ পড়াদের নামের তালিকা ৪ সপ্তাহের মধ্যে কমিশনকে পাঠাতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এবং তারপর বিদেশি ট্রাইব্যুনাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক কিংবা বিদেশি ট্রাইব্যুনাল কারো নাগরিকত্ব নিশ্চিত করলে তার নাম উঠবে ভোটার তালিকায়, রায়ে বলেছে শীর্ষ আদালত।
দেশে প্রথম এসআইআর হয়েছে বিহারে। তারপর পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, পুদুচেরি, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট সহ কয়েকটি রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এসআইআর হয়েছে নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে।
তৃতীয় পর্যায়ে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে দেশের ১৬ রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। এরপর বাকি থাকবে হিমাচল প্রদেশ, জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখ।
উল্লেখ্য, অসমে এনআরসি হয়ে যাওয়ায় এসআইআর হয়নি। এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম রয়েছে বিচারাধীন তালিকায়। যারা সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।
এই ২৭ লক্ষ মানুষকে সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ অনুযায়ী যেতে হবে ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনাল থেকেই এই ২৭ লক্ষের নাম ভোটার তালিকায় থাকবে কি না স্থির করা হবে।