বন্ধ আইফেল টাওয়ার, প্যারিসে তোলপাড়। হিন্দু ধর্মীয় দল আসতেই মহিলা কর্মীদের স্থানান্তরের নির্দেশ!

19

নিউজ ডেস্ক: ফ্রান্সের প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারে হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধি দলের পরিদর্শনের সময় মহিলা কর্মীদের নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সরে যাওয়ার এবং মেলামেশা সীমিত করার নির্দেশ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ। ঘটনার প্রতিবাদে আইফেল টাওয়ারের কর্মীরা ব্যাপক ধর্মঘট শুরু করায় সোমবার পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয় বিশ্বখ্যাত এই পর্যটন কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই ঘটনাটির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে প্যারিস নগর কর্তৃপক্ষ।
কী ঘটেছিল আইফেল টাওয়ারে?
গত শনিবার বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা (BAPS)-এর একটি প্রতিনিধি দল আইফেল টাওয়ারে ব্যক্তিগত সফরে গিয়েছিল। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই প্রতিনিধি দলের অনুরোধে, ওই সময় কর্তৃপক্ষ আইফেল টাওয়ারের মহিলা কর্মীদের তাঁদের কাজের জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলে এবং তাঁদের জায়গায় পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এমনকি, প্রতিনিধি দলটি যে এলাকায় উপস্থিত ছিল, সেখানে মহিলা কর্মীদের চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধি ডায়ান ডেভন ফরাসি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, মহিলা কর্মীদের প্রকাশ্যে এইভাবে অপমান করা এবং তাঁদের কাজের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কর্মীদের ক্ষোভ এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তাঁরা ধর্মঘটের ডাক দিতে বাধ্য হন। তিনি আরও জানান, পরে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্মীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে।
ভারতের অবস্থান
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, প্যারিসের বিএপিএস (BAPS) সংস্থার একটি মন্দির উদ্বোধনের বিষয়ে তাঁরা অবগত। তবে আইফেল টাওয়ার সংক্রান্ত নির্দিষ্ট ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর (সংস্থা এবং টাওয়ার কর্তৃপক্ষ) নিজস্ব বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল শুভেচ্ছা প্রসঙ্গ:
দিল্লিতে যেদিন বহুতল ভেঙে পড়ে ৭ জনের মৃত্যু এবং কয়েকজন আহত হয়, সেই রাতেই বিএপিএস মন্দিরের উদ্বোধন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্স হ্যান্ডলে শুভেচ্ছা জানান। এই প্রসঙ্গে বিদেশ মন্ত্রক বলেছে, এধরনের আন্তর্জাতিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শুভকামনা জানানো একটি সাধারণ কূটনৈতিক রীতি। এই শুভেচ্ছাবার্তার সাথে আইফেল টাওয়ারের ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই।
বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা-র প্রায় ১০০ জনের একটি দল আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনে গেলে অভিযোগ ওঠে যে, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের খাতিরে সেখানকার মহিলা কর্মীদের কর্মস্থল থেকে সরিয়ে পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে কর্মীরা ধর্মঘট ডাকায় সোমবার আইফেল টাওয়ার বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ফ্রান্সের লিঙ্গসমতা বিষয়ক মন্ত্রী সহ ফরাসি রাজনীতিবিদরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন।
সংস্থার সাফাই ও বিতর্ক
বিতর্কের মুখে পড়ে বিএপিএস (BAPS)-এর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রতিনিধি দলটি বড় হওয়ার কারণে যাতে সাধারণ পর্যটকদের সমস্যা না হয়, তাই খোলার শুরুতেই এই ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছিল। তারা আরও দাবি করেছে, কাউকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। তবুও, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও কষ্ট বা অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। প্রসঙ্গত, ঘটনার পরদিনই (রবিবার) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে প্যারিসে বিএপিএস স্বামীনারায়ণ মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, আইফেল টাওয়ার পরিচালনকারী সংস্থা ‘SETE’ স্বীকার করে নিয়েছে যে, প্রতিনিধি দলটি মহিলা কর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা সীমিত রাখার আবেদন করেছিল। সংস্থাটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, এই ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া একেবারেই উচিত হয়নি। এটি আমাদের মূল নীতি ও লিঙ্গসমতার বিরুদ্ধে। আইফেল টাওয়ার পরিচালন পর্ষদের সভাপতি অ্যারিয়েল ওয়েল জানান, কীভাবে এই ঘটনা ঘটল তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।
উত্তাল ফরাসি রাজনীতি ও তীব্র প্রতিক্রিয়া:
প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রিগয়ার এই বৈষম্যকে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন এবং ধর্মঘটে কর্মীদের সমর্থন জানিয়ে অবিলম্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছেন।
ফরাসি লিঙ্গসমতা বিষয়ক মন্ত্রী অরোরে বার্জে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ফ্রান্সে কোনও ধর্ম বা অনুশাসনকে দেশের আইনের ওপরে স্থান দেওয়া হয় না। এখানে মহিলাদের সরে যেতে বলা যায় না।
প্রাক্তন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আতাল কড়া সুর চড়িয়ে মন্তব্য করেছেন, ফ্রান্সে কোনও সংস্কৃতি বা ধর্ম এসে ঠিক করে দেবে না যে সমাজে মহিলাদের অবস্থান কোথায় হওয়া উচিত।
দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক নেত্রী মারিন ল পেন ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে জানান, ফ্রান্সে মহিলাদের উপস্থিতি ‘সীমিত’ করার যেকোনো চেষ্টা চিরকাল প্রতিহত করা হবে।
প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনে যায়। তবে এই নজিরবিহীন ঘটনার জেরে সোমবার সারা দিন টাওয়ারটি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় ভোগান্তির মুখে পড়েন হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক।