পৃথা দাশগুপ্ত,কলকাতা: বাংলা সিনেমা, টেলিভিশন এবং তথ্যচিত্রের জগতে দীর্ঘ কয়েক দশকের উজ্জল অধ্যায়ের অবসান। প্রয়াত পরিচালক রাজা সেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। জাতীয় পুরস্কার প্রাপক পরিচালকের শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হওয়ায় এস এস কে এম হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল।১৯৫৫ সালে কলকাতায় জন্ম রাজা সেনের। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর যোগাযোগ । টেলিভিশনের জন্য একের পর এক সাহিত্যনির্ভর কাজ তৈরি করে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।রাজা সেন চলচ্চিত্র পরিচালক তো বটেই পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং শিল্পজগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরেছিলেন তিনি।তথ্যচিত্র এবং টেলিভিশনে তাঁর কাজ তাঁকে আলাদা জায়গা করে দিয়েছিল। বাংলা টেলিভিশনের সাহিত্যনির্ভর কাজকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন তিনি।‘সুবর্ণলতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘সম্পর্ক’, ‘তারাশঙ্করের ছোটগল্প’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘বঙ্কিম সাহিত্যে নারী’-র মতো কাজ পরিচালনা করেছেন তিনি ।বড় পর্দায় রাজা সেনের সবচেয়ে বড় কাজ ‘দামু’ । ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, শিশুমনের সরলতা, অনাথ শিশুর গল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল । ‘দামু’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা শিশুচলচ্চিত্রের সম্মান পায়।‘দামু’-র আগে এবং পরেও জাতীয় পুরস্কারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। ‘আত্মীয় স্বজন’-এর জন্য সেরা পরিবারকল্যাণমূলক ছবির জাতীয় পুরস্কার পান। তাঁর ঝুলিতে ছিল মোট তিনটি জাতীয় পুরস্কার।রাজা সেনের ছবির তালিকায় রয়েছে ‘দামু’, ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘তিনমূর্তি’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘মায়া মৃদঙ্গ’-সহ একাধিক ছবি। তাঁর পরিচালিত ‘তিনমূর্তি’ ছবিটির সঙ্গে তপন সিংহের বিশেষ যোগ ছিল। তপন সিংহের পরিকল্পনা করা ছবিটির কাজ তাঁর মৃত্যুর পর রাজা সেনের হাতে আসে এবং তিনি সেটি সম্পূর্ণ করেন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকেও বড় পর্দায় নিয়ে এসেছিলেন রাজা সেন। তাঁর ‘ল্যাবরেটরি’ ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রবিনা ট্যান্ডন, সব্যসাচী চক্রবর্তী, রঞ্জিত মল্লিক-সহ একাধিক শিল্পী। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল রবীন্দ্রনাথের গল্পের চলচ্চিত্ররূপ।শুধু বাংলা নয়, ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়েও কাজ করেছেন রাজা সেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরির কাজও করেছিলেন তিনি। ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিত্বকে তথ্যচিত্রের মাধ্যমে নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ছিল বরাবরই স্পষ্ট।টেলিভিশনে তাঁর কাজের প্রভাবও কম নয়। বাংলা টেলিভিশনে সাহিত্যনির্ভর ধারাবাহিককে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘সুবর্ণলতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর মতো কাজ সেই সময়ের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল। ‘সুবর্ণলতা’-র জন্য টেলিভিশন প্রযোজনা এবং ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর জন্য পরিচালনায় পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।২০১৬ সালে ‘মায়া মৃদঙ্গ’ ছবির জন্য দাদা সাহেব ফালকে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সেরা পরিচালক জুরি সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন। জীবনের শেষ পর্ব পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
রাজা সেন নেই কিন্তু থেকে গেল তাঁর তৈরি ছবি সৃষ্টি। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।