নিউজ ডেস্ক: তীব্র গরমে পুড়ছে গোটা ইউরোপ। ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইতালিতে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে, তবু এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারে নারাজ ইউরোপের অধিকাংশ নাগরিক। বরং বৈদ্যুতিক পাখা, বরফ বা ঠান্ডা জলে স্নানের প্রতি আগ্রহী গরমে নাজেহাল বাসিন্দাদের। ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং যুক্তরাজ্য জুড়ে বহু স্কুল বন্ধ। বিভিন্ন জায়গায় রেল পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে কারণ প্রচণ্ড গরমে মাথার ওপরের বিদ্যুতের তার ঝুলে যায় এবং রেললাইন বেঁকে যেতে পারে।
আমেরিকার প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িতে এসি থাকলেও ইউরোপে এই হার মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি। ব্রিটেনে মাত্র ৫ শতাংশ বাড়িতে এসি রয়েছে, ফ্রান্সে এই হার মাত্র ২০ শতাংশ। শুধু ফ্রান্সেই চলতি মরশুমে গরমে মৃত্যু হয়েছে হাজারের বেশি মানুষের। ইউরোপে তাপপ্রবাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ।
এসি ব্যবহারে ফরাসিরা নারাজ। কারণ তারা এসিকে দৃষ্টিকটু ও আমেরিকান সংস্কৃতি বলে মনে করে। ফরাসিদের চিরন্তন বিশ্বাস যে, ক্রমাগত ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। এবং এজন্য এসিকে অধিকাংশ ফরাসিই মনে করে বিলাসবহুল পণ্য।তাদের কাছে, পুরু পাথরের দেওয়াল, কাঠের শাটার এবং খোলা জানালাযুক্ত বাড়িগুলো অনেক ভালো।
ইউরোপের অনেক দেশে ঐতিহাসিকভাবে ঘর ঠান্ডা করার তেমন কোনো প্রয়োজন ছিল না। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের দেশগুলোতে আগে তাপপ্রবাহ হলেও তা বর্তমানের মতো ভয়াবহ বা দীর্ঘস্থায়ী ছিল না।
ইউরোপে এসিকে প্রয়োজনের বদলে বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়। এটি কেনা এবং চালানোও বেশ ব্যয়বহুল। অনেক ইউরোপীয় দেশে বিদ্যুতের দাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি, উল্টোদিকে মানুষের আয় তুলনায় কম। ফলে এসির খরচ মেটানো অনেক ইউরোপীয়র জন্য কঠিন।

স্থাপত্যশৈলী ও পুরনো ভবন
দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর পুরনো ভবনগুলো গরমের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোর পুরু দেয়াল ও ছোট জানালা সরাসরি রোদ আটকায় এবং বাতাস চলাচলে সাহায্য করে। এতে ঘর ঠান্ডা থাকে এবং কৃত্রিম শীতলীকরণের প্রয়োজন কম হয়। এবং ইউরোপ মহাদেশের অন্য অংশের বাড়িগুলো গরমের কথা ভেবে বানানো হয়নি। ইউরোপের অনেক ভবনই বেশ পুরনো এবং এসি প্রযুক্তি জনপ্রিয় হওয়ার আগে তৈরি। ইংল্যান্ডে প্রতি ছয়টি বাড়ির একটি ১৯০০ সালের আগে নির্মিত।
আইনি বাধা ও নীতিগত সমস্যা
ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এসির অনুমোদন পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী এলাকা বা সংরক্ষিত ভবনের বাইরের দিকে এসি বসলে দৃশ্যপট নষ্ট হতে পারে—এমন অজুহাতে কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় না। পরিবেশগত নীতিমালার বিষয়টিও রয়েছে। এ ছাড়া কোনও বাড়িতে এসি বসানোর আগে প্রতিবেশীদের অনুমতিও প্রয়োজন ইউরোপের যে কোনও দেশে। ইউরোপ ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এসির ব্যবহার বাড়লে এই লক্ষ্য পূরণ কঠিন হতে পারে। এসি প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি বাইরের গরম বাতাস আরও বাড়িয়ে দেয়। প্যারিসে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসির কারণে বাইরের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর জন্য এই প্রভাব বেশ ক্ষতিকর। জ্বালানি বাঁচাতে ২০২২ সালে স্পেন একটি নিয়ম চালু করেছে। এর ফলে সরকারি জায়গায় এসির তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা নিষিদ্ধ।
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
ইউরোপ এখন বিশ্বের অন্য অঞ্চলের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। ফলে এসির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বদলাতে শুরু করেছে। এখন ইউরোপের দেশগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, হয় তারা পরিবেশের ক্ষতি করে এসি ব্যবহার করবে, নয়তো গরম মোকাবিলায় বিকল্প কোনো পথ খুঁজবে। আইইএ-র প্রতিবেদন বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এসির সংখ্যা বেড়ে ২৭৫ মিলিয়নে পৌঁছতে পারে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।