প্রাক্তন সম্পাদকের এই দশা! সাধারণ মানুষের কী হবে?

13

নিউজ ডেস্ক: দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রাক্তন সম্পাদক আর. রাজাগোপালের ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার জেরে পাসপোর্টও রিনিউ করেনি কর্তৃপক্ষ। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা শুধু দেশের সাংবাদিক মহল ও সাধারণ মানুষই নয়, আইনি প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে আর রাজাগোপালের নাম মুছে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এরপর তিনি তাঁর ২০ বছরের পুরনো পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করতে গেলে, কলকাতা পুলিশ তাঁর ভেরিফিকেশন আটকে দেয় এবং এজেসি বোস রোডের কন্ট্রোল অফিস থেকে ফাইলে ‘বাতিল তালিকায় পাঠিয়ে দেয়। অথচ এমন কোনও আইন নেই যা বলে যে এসআইআর তালিকায় নাম পড়লে পাসপোর্ট রিনিউ হবে না।
গত তিন দশক ধরে কলকাতার বালিগঞ্জের বাসিন্দা আর. রাজাগোপাল। অথচ ২৭ মার্চ হঠাৎ করেই ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম কেটে দেয় নির্বাচন কমিশন। এসআইআরে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে, রাজাগোপাল সেই প্রক্রিয়ারই শিকার।
কমিশনের দাবি, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় রাজাগোপালের বা তাঁর প্রয়াত বাবার নামের কোনও ‘যৌক্তিক সূত্র’ মেলেনি। অথচ তাঁর বাবা ছিলেন একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এবং কেরালার গান্ধী স্মারক নিধির প্রাক্তন সম্পাদক। সমস্ত বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও কোনও পূর্ব নোটিশ ছাড়াই রাজাগোপালের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
পাসপোর্ট নবায়ন হয়নি বলে, ১৭ এপ্রিল ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের মেয়ের বিয়েতে উপস্থিত থাকতেপারেননি এই প্রথিতযশা সম্পাদক।
ভারতে ৫৭ বছর ধরে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বসবাস, পড়াশোনা ও সাংবাদিকতা করার পর আজ বৃদ্ধ বয়সে রাজাগোপালকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তিনি ভারতীয় এবং তাঁর মা-বা সত্যিই এই ভারতে জন্মেছিলেন। ১৯৫৮-৫৯ সালের স্কুল রেজিস্টার বা ১৯৬৫ সালের কলেজের নথি খুঁজতে এখন তাঁকে কেরলমের ধুলোবালি মাখা পুরনো আর্কাইভে হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে।
যে দেশে আমি ৫৭ বছর ধরে নাগরিক হিসেবে সব দায়িত্ব পালন করলাম, আজ সেখানে আমার মা-বাবার অস্তিত্বের প্রমাণ জোগাড় করতে হচ্ছে। আমি ফুটবলের মতো এক অফিস থেকে অন্য অফিসে লাথি খাচ্ছি, বলেছেন আর. রাজাগোপাল।
সাংবাদিকদের বক্তব্য, রাজাগোপালের মতো একজন উচ্চশিক্ষিত, প্রভাবশালী এবং সম্পদশালী প্রবীণ সম্পাদকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে বন্ধু-বান্ধব ও আইনজীবী লাগিয়ে পুরনো নথি খোঁজা বা ট্রাইব্যুনালে আপিল করা। কিন্তু ভারতের যে কোটি কোটি সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর অশিক্ষার কারণে নিজেদের নথিপত্র সযত্নে রাখতে পারেনি, এই ‘নথি রাজনীতির’ খাঁড়া যখন তাদের ওপর পড়বে, তখন তাদের আশ্রয় কোথায় হবে? ডিটেনশন ক্যাম্প ছাড়া তাদের আর কী গতি থাকবে?
রাজাগোপাল লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ অন্যান্য বাসিন্দার মতো আমাকেও তথাকথিত “যৌক্তিক অসঙ্গতি”র কারণে বাদ দেওয়া হয়েছিল। আমার ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার পরেও কোনও কারণ জানানো হয়নি এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত একটি ট্রাইব্যুনালে আমার আপিলটি এখন বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে আমি সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি।


আরও হতাশাজনক হল, আমার পাসপোর্ট নবায়নের আবেদনের পরিণতি। যদিও আমি ১৯ মার্চ, ২০২৬ তারিখে বায়োমেট্রিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছি, পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়নি, কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই।
কার্যত, আমি এক নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি, যদিও সম্প্রতি সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। আমার বেশিরভাগ সময় এখন পারিবারিক নথি পুনর্গঠন এবং কয়েক দশক আগের দলিলপত্র জোগাড় করার চেষ্টায় ব্যয় হয়। আমার দিন শুরু হয় আমার ভোটাধিকারের আপিলের অবস্থা এবং তারপর পাসপোর্ট ট্র্যাকার পরীক্ষা করার মাধ্যমে।
তবে আশার কথা এই যে রাজাগোপালের হয়রানির তীব্র প্রতিবাদ করেছে এডিটর্স গিল্ড অব ইন্ডিয়া। এখন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের টনক নড়ে কি না সেটাই দেখার।