মোদী-মেলোনির দৌলতে পার্লে (PARLE)-এর পোয়াবারো, বাড়ল শেয়ারের দাম

35

নিউজ ডেস্ক: শাহরুখ খান ও অমিতাভ বচ্চনের মতো মহাতারকাদের দিয়ে বিজ্ঞাপন তৈরি করতে পার্লে ইন্ডাস্ট্রি খরচ করত প্রায় ৫ থেকে ১৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো বিশ্ব-তারকারা একটি বড় বিজ্ঞাপনের জন্য ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন। এই ধরনের তারকাদের করা একটি মাত্র ইনস্টাগ্রাম পোস্টের মূল্যই গিয়ে দাঁড়ায় কয়েক কোটি টাকায়। সেখানে মোদী-মোলোনি কার্যত সুবিধাই করে দিলেন পার্লে ব্র্যান্ডকে। পার্লে কোম্পানির শেয়ার বাড়ল ৫ শতাংশেরও বেশি।

পার্লে

ফের শিরোনামে পার্লে-জি

এমন এক সময় ছিল, যখন মুম্বাইয়ের ‘ভিলে পার্লে ইস্ট’-এ অবস্থিত সেই আইকনিক কারখানাটি থেকে সদ্য বেক করা বিস্কুটের সুবাস পুরো এলাকা জুড়ে ভেসে বেড়াত। পূর্ব দিকের কোলডংরি ও ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেস হাইওয়ে থেকে শুরু করে পশ্চিমের উপকণ্ঠে অবস্থিত ‘মিঠিভাই কলেজ’ পর্যন্ত। সেই কারখানাটি অবশ্য অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু নামটি আজও টিকে আছে—কেবল এই এলাকার নামের অংশ হিসেবেই নয়, বরং সমগ্র ভারতজুড়েই। বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে এক প্যাকেট ‘পার্লে মেলোডি’ টফি উপহার দেন।

এর মধ্য তাঁদের ভাইরাল হওয়া ‘মেলোডি’ ডাকনামটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এর শেয়ারের দামও বেড়েছে। মেলোনিকে মোদীর দেওয়া উপহারটি পাড়ার মোড়ের এই প্রিয় টফিটিকে রাতারাতি এক আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করেছে। মেলোনি নিজে এই টফিটির প্রশংসা করে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন; আর ঠিক তার পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘#Meloni’ হ্যাশট্যাগ সম্বলিত মিমের এক বিশাল ঢেউ বয়ে যায়।

মেলোনিকে ‘মেলোডি’ উপহার মোদীর

ভারত-ইটালির দুই প্রধানমন্ত্রীর কূটনীতির এই বিশেষ মুহূর্তে, ভারতের এই টফি এবং সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডটি বিশ্বমঞ্চে বিনামূল্যেই প্রচারের সুযোগ পেল। যাঁদের X হ্যান্ডলে এবং ইনস্টাগ্রামে মোট ফলোয়ার ২১ কোটিরও বেশি। বর্তমানে ‘পার্লে প্রোডাক্টস’—যে প্রতিষ্ঠানটি ‘মেলোডি’ (Melody) টফির মালিক—তাদের কাছে এর চেয়ে চমৎকার কোনো জনসংযোগ বা ‘পিআর’ (PR) সাফল্য কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। এমন এক যুগে, যেখানে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ ও চলচ্চিত্র তারকারা পণ্যের প্রচার বা ‘এন্ডোর্সমেন্ট’-এর জন্য কোটি কোটি টাকা পারিশ্রমিক নেন, সেখানে দুজন বিশ্বনেতা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই টফিটিকে বিশ্বমঞ্চে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছেন। সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিএমও (CMO) মায়াঙ্ক শাহ এই অপ্রত্যাশিত প্রচারের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

সংস্থার উত্থানের কাহিনী

সংস্থার উত্থানের গল্পটি অনেকটা ‘চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরি’-র একটি দেশি সংস্করণের মতো। এর শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তাদের সেই ‘সোনালি টিকিট’ (Golden Ticket) ছিল গ্লুকোজ বিস্কুট। ১৯২৯ সালে মুম্বাইয়ের ‘ভিলে পার্লে’ এলাকায় মোহনলাল চৌহান প্রতিষ্ঠা করেন। এই কোম্পানিটি শুরুতে মিষ্টিজাতীয় পণ্য তৈরির কাজ করত। পরবর্তীতে তারা ‘গ্লুকো’ বাজারে আনে। ১৯৩৯ সালে ‘পার্লে-জি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। সময়ের সঙ্গে এটি বিস্কুট ও ক্যান্ডি শিল্পের এক বিশাল শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং বিক্রির পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত বিস্কুট ব্র্যান্ডের মর্যাদা লাভ করে।

সংস্থার বিস্তার

১৯৭০-এর দশকে চৌহান পরিবার তাদের ব্যবসাটি বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত করে ফেলে। এর ফলে তিনটি স্বতন্ত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয়। যারা আজও নামটি বহন করে চলেছে। তবে প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। এদের মধ্যে প্রথমটি হলো ‘পার্লে প্রোডাক্টস’—বিস্কুট ও মিষ্টান্ন জগতের এক বিশাল প্রতিষ্ঠান। যারা ‘মেলোডি’ টফিও উৎপাদন করে থাকে। ‘পার্লে-জি’ ছাড়াও তারা ‘মোনাকো’, ‘ক্র্যাকজ্যাক’ এবং ‘হাইড অ্যান্ড সিক’-এর মতো জনপ্রিয় বিস্কুটগুলোও উৎপাদন করে থাকে।

অতিমারিতে ভরসা ছিল পার্লে-জি

এই বিস্কুট এতটাই আইকনিক বা সুপরিচিত যে, কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় আম আদমির কাছে অপরিহার্য এক খাদ্যে পরিণত হয়েছিল। এর ছোট প্যাকেটের দাম মাত্র ৫ টাকা। পরিযায়ী শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় এর ওপরই নির্ভর করেছিলেন। অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলো ত্রাণ হিসেবে লক্ষ লক্ষ প্যাকেট বিতরণ করেছিল। এই ব্র্যান্ডটি ইতিমধ্যেই বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে পৌঁছে গেছে। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি ইউরোপ এবং তার বাইরের নতুন নতুন দর্শকদের মাঝে ব্র্যান্ডটির পরিচিতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতের একটি সংস্থার ডুবন্ত নৌকার পালে যেন হাওয়া লাগল। যদিও সমাজ মাধ্যমে একাংশ দাবি করছেন মোদীর এই টফি উপহার নিছকই সাধারণ বিষয়? নাকি এর পিছনেও রয়েছে কোনও কূটনৈতিক কৌশল। তা সময় বলবে। তবে আপাতত ইতালি-ভারত সহ বিশ্বের কাছে চর্চায় মেলোনি ও মোদীর রসায়ন। সঙ্গে ভারত-ইতালির কূটনৈতিক সম্পর্ক।