সিজেপির কি সরকারি স্কুল পরিদর্শনের অধিকার আছে?

40

নিউজ ডেস্ক: গুয়াহাটিতে ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সহ ৪৬ কর্মীকে পুলিশ দিনভর আটক করে রাখার পর যে প্রশ্ন উঠে আসছে তা হল সরকারি স্কুল পরিদর্শনের অধিকার কি কোনও সংগঠনের আছে?
স্কুলের অভিভাবকদের উদ্বেগ প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দারা স্কুলের বিভিন্ন ঘাটতি চিহ্নিত করতে পারে এবং নাগরিকরা সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তারপরও গণতন্ত্রে এমন একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে যা রাজনৈতিক প্রচারের আড়ালে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। কোনও সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অধিকার আর সেই প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন বা তদারকি করার আইনি ক্ষমতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
একটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে রাষ্ট্রের উপস্থিতির অন্যতম দৃশ্যমান নিদর্শন সরকারি বিদ্যালয়। সরকারি অর্থে এর শ্রেণিকক্ষ নির্মিত হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এর শিক্ষক নিয়োগ করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয় যার মূল লক্ষ্য সুযোগের পরিধি বাড়ানো। ঠিক এই কারণেই সরকারি বিদ্যালয়ের অবস্থার বিষয়টি জনগণের নিরন্তর মনোযোগের দাবি রাখে।
অসমে সিজেপি-র সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা যখন ঘোষণা করলেন যে তাঁরা অসমে ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছেন, তখন এই পার্থক্যটি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। সিজেপি এর আগেও অন্যান্য স্থানে অনুরূপ কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। সেখানে সরকারি বিদ্যালয় পরিদর্শনের বিষয়টিকে তারা পরিকাঠামো ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের এই প্রচারকে জনসমক্ষে বিদ্যালয়ের ‘অডিট’ বা ‘পরিদর্শন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। জনশিক্ষার প্রকৃত ঘাটতিগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার মধ্যে নীতিগতভাবে আপত্তিকর কিছু নেই। তবে প্রশ্নটি আরও সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ: কোনও সংগঠন যখন তাদের কর্মসূচিকে ‘পরিদর্শন’ বলে আখ্যায়িত করে, তখন কি তারা আসলেই কোনও সরকারি পরিদর্শনের আইনি কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা অর্জন করে?
এর উত্তর নিহিত রয়েছে অসমের শিক্ষা-ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে। প্রাথমিক শিক্ষা দফতর স্পষ্টভাবে বিদ্যালয় পরিদর্শন ও তদারকিকে তাদের কাজের অন্যতম অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে। ‘অসম শিক্ষা অধিকার বিধিনিয়ম’ অনুযায়ী, দফতরের অধীন বিদ্যালয়ের তদারকি ও পরিদর্শনের বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য পরিচালককে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং দায়িত্ব পালনের জন্য অনুমোদিত শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিযুক্ত করার বিধান রয়েছে। সুতরাং, সরকারি পরিদর্শন হল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ। এর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব, কার্যপদ্ধতি এবং ফলাফল বা পরিণতির বিষয়টি জড়িত। কোনও সংগঠন কোনও বিদ্যালয় খতিয়ে দেখতে চাইলে কিংবা তাদের কর্মসূচিকে ‘অডিট’ বা নিরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করলেই তারা সেই একই কর্তৃত্ব বা অধিকার লাভ করে না।
এর অর্থ এই নয় যে, সরকারি বিদ্যালয়কে জন-পর্যবেক্ষণ বা জনগণের নজরদারির আওতার বাইরে রাখতে হবে। বরং বিষয়টি ঠিক তার উলটো। সরকারি বিদ্যালয় একটি গণ-প্রতিষ্ঠান এবং এর কার্যকারিতা অভিভাবক, স্থানীয় বাসিন্দা ও করদাতাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নাগরিক যদি পানীয় জলের অভাব, দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো বা অন্য কোনও ঘাটতি লক্ষ করেন, তবে সেই উদ্বেগের কথা শোনা নেওয়া উচিত। সুশীল সমাজের কোনও সংগঠন কোনও সমস্যা কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরতে পারে। কোনও সংগঠন জনসমক্ষে কোনও বিষয় উত্থাপন করে প্রয়োজনীয় সংশোধনীমূলক পদক্ষেপের দাবি জানাতে পারে। এধরনের অংশগ্রহণ একটি সুস্থ গণতন্ত্রের অংশ।
অন্যান্য রাজ্যে সিজেপি-র স্কুল-কেন্দ্রিক কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, রাজস্থানে স্কুল পরিদর্শনের সময় সরকারি স্কুলের প্রাঙ্গণে প্রবেশ এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ছবি বা ভিডিয়ো করার বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিক পদক্ষেপে শিশুদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদার বিষয়টি এবং স্কুলের ভেতরে বহিরাগতদের কার্যকলাপের জন্য যথাযথ অনুমতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক নীতিটি অত্যন্ত স্পষ্ট: স্কুলের ওপর জনগণের মালিকানা থাকার অর্থ এই নয় যে, স্কুলের প্রাঙ্গণে অবাধ প্রবেশাধিকার থাকবে।
সিজেপি-র সদস্য বা অন্য কোনও সংস্থা যদি কোনও সরকারি স্কুল পরিদর্শন করে কোনো প্রকৃত ঘাটতি বা ত্রুটি চিহ্নিত করে, তবে সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নজরে না আনার কোনো কারণ নেই। কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে সেই অভিযোগ যাচাই করে দেখতে পারে। যদি ঘাটতি বা ত্রুটির বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তবে যথাযথ সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
এক্ষেত্রে সরকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সরকারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা বা কাঠামো বিদ্যমান থাকলেই যে অভিভাবক, সাধারণ নাগরিক বা সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যকে উপেক্ষা করা যাবে— তা কিন্তু নয়। দায়িত্বশীল প্রশাসনের উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্যকে স্বাগত জানানো, তা যাচাই করা এবং প্রয়োজনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সুতরাং, নাগরিকদের দায়িত্বশীল তদারকি বা পর্যবেক্ষণের ফলে অসমের সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে না, বরং এর মাধ্যমে তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।